সুবর্ণচরে অবৈধ ইটভাটা ভেঙে দিলেও চলে পুরো মৌসুমজুড়ে, কৃষিজমি ও পরিবেশ রক্ষায় প্রশাসনের অভিযান নিয়ে প্রশ্ন
মোঃ রফিকুল ইসলাম নোয়াখালী
নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলায় অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে প্রশাসনের অভিযান চললেও বন্ধ হচ্ছে না কৃষিজমির মাটি কাটা,ইট ভাটার জ্বালানি হিসেবে কাঠের ব্যবহার ও অবৈধভাবে ইট উৎপাদনের কার্যক্রম—এমন অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের।
তাঁদের দাবি, প্রতিবছর কয়েকটি ইটভাটায় অভিযান চালিয়ে ভেঙে দেওয়া হলেও মৌসুমের বাকি সময়জুড়ে, ভেঙে দেওয়া ইটভাটা সহ, অন্যান্য ইটভাটায় কার্যক্রম অব্যাহত থাকে। ফলে একদিকে কমছে কৃষিজমি, অন্যদিকে বাড়ছে পরিবেশদূষণের ঝুঁকি। এ পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, বিচ্ছিন্ন অভিযানেই কি বন্ধ হবে সুবর্ণচরের অবৈধ ইটভাটার কার্যক্রম?
সর্বশেষ গত বুধবার (৭ অক্টোবর) দুপুরে উপজেলার চরজব্বর ইউনিয়নের চর পানাউল্লাহ এলাকায় এ.কে.বি ব্রিকস নামে একটি ইটভাটায় অভিযান চালিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।
কৃষিজমিতে অবৈধভাবে ইটভাটা স্থাপন এবং ইট তৈরির কাঁচামাল সংগ্রহের জন্য কৃষিজমি থেকে মাটি কাটার অভিযোগে ভ্রাম্যমাণ আদালত ইটভাটার মালিক মো. আকবর হোসেনকে দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেন। একই সঙ্গে ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্দেশে অবৈধভাবে স্থাপিত ইটভাটাটি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, সুবর্ণচর উপজেলায় অবৈধ ইটভাটার সংখ্যা (১৫)টি। এর মধ্যে কৃষিজমিতে ইটভাটা স্থাপন এবং ইট তৈরির জন্য কৃষিজমির মাটি ব্যবহারের অভিযোগে এ.কে.বি ব্রিকসে অভিযান পরিচালনা করা হয়। ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন অনুযায়ী ভ্রাম্যমাণ আদালত এ অর্থদণ্ড দেন।
এর আগে গত ৩০ সেপ্টেম্বর উপজেলার চর আমান উল্যাহ ইউনিয়নের যমুনা ব্রিকসে অভিযান চালানো হয়। প্রয়োজনীয় লাইসেন্স না থাকায় ওই ইটভাটাটিও ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে দুটি ইটভাটায় অভিযান পরিচালনা করায় অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে প্রশাসনের তৎপরতা সামনে এসেছে। তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, এসব অভিযানের পর, বন্ধ ঘোষণা করা ইটভাটা গুলো সহ অন্য ইটভাটাগুলোর কার্যক্রম বন্ধে কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে?
অভিযান হয়, তবু বন্ধ হচ্ছে না কার্যক্রমঃ
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সুবর্ণচর উপজেলার পশ্চিম চরজব্বরে তাহেরা ব্রিকস, মাহিন ব্রিকস, দক্ষিণ চরকচ্চপিয়ায় মুক্তা ব্রিকস, চরবাগ্যায় আল্লাহর দান ব্রিকস, চর আমান উল্যাহ এলাকায় রোহান ব্রিকস এবং চরজব্বর এলাকায় জহুরা ব্রিকস ও পপুলার ব্রিকসসহ আরও কয়েকটি ইটভাটা অবৈধভাবে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বলে তাঁদের অভিযোগ।
তাঁদের দাবি, প্রতিবছর ইটভাটার মৌসুমে কৃষিজমি থেকে মাটি সংগ্রহ করে ইট তৈরির প্রবণতা দেখা যায়। প্রশাসন মাঝেমধ্যে অভিযান পরিচালনা করলেও সব ইটভাটার বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। ফলে কিছু ইটভাটায় অভিযান পরিচালনার পরও অন্যত্র ইট উৎপাদন চলতে থাকে।
স্থানীয়দের অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে সংশ্লিষ্ট ইটভাটাগুলোর বৈধতা, পরিবেশগত ছাড়পত্র, প্রয়োজনীয় লাইসেন্স এবং কৃষিজমি থেকে মাটি সংগ্রহের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
কাঠ-টিনের চিমনিতে ইট পোড়ানোর অভিযোগঃ
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ইটভাটার কার্যক্রম পরিচালনায় কাঠ ও টিন দিয়ে তৈরি চিমনি ব্যবহারের ঘটনা রয়েছে।এ পদ্ধতিতে গত ২০ বছরের অধিক সময় থেকেই ইট উৎপাদন চলছে অনেক ইট ভাটার।
তাঁদের দাবি, ইটভাটার অবকাঠামো ভেঙে দেওয়ার পরও কিছু স্থানে বিকল্প কাঠামো ব্যবহার করে ইট পোড়ানোর কার্যক্রম চালানো হচ্ছে কি না, তা প্রশাসনের সরেজমিনে তদন্ত করা প্রয়োজন।
তবে কোন কোন ইটভাটায় বর্তমানে এ ধরনের চিমনি ব্যবহার করা হচ্ছে, সেগুলোর মালিক কারা এবং সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোর বৈধতা কী—এসব বিষয় স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
কৃষিজমির মাটি কাটায় দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির আশঙ্কাঃ
কৃষিজমির উপরিভাগের উর্বর মাটি কেটে ইট তৈরির কাজে ব্যবহার করা হলে জমির উৎপাদনক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে জমির স্বাভাবিক গঠন পরিবর্তন, জলাবদ্ধতা এবং ফসল উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।
অন্যদিকে, ইটভাটার জ্বালানি ও ধোঁয়া থেকে সৃষ্ট দূষণ আশপাশের জনবসতি, গাছপালা ও পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে কৃষিপ্রধান সুবর্ণচরের মতো এলাকায় কৃষিজমি রক্ষা এবং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
এ অবস্থায় শুধু ইটভাটা ভেঙে দেওয়াই নয়, কৃষিজমি থেকে অবৈধভাবে মাটি কাটা বন্ধ করা, ইটভাটার বৈধতা যাচাই এবং নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে পুনরায় কার্যক্রম চালানো হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত তদারকির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
প্রশাসনের বক্তব্যঃ
অবৈধ ঈদ ভাটা গুলোর অভিযান, এবং কার্যকরী পদক্ষেপের বিষয়ে জানতে চাইলে, নোয়াখালী পরিবেশ কর্মকর্তা শওকত আরা কলি জানান, আমরা বিভিন্ন সময় অভিযান পরিচালনা, জরিমানা এবং ইটভাটা বন্ধ ঘোষণা,মামলা ও দায়ের করি।
পুনরায় এই ইটভাটা গুলো চালুর বিষয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, তারা আমাদেরকে অবগত না করেই, ইটভাটা গুলো চালাচ্ছে।পুনরায় চালের বিষয়ে খবর পেলে অবশ্যই আমরা আবার অভিযান পরিচালনা করব এবং বন্ধ করব। তিনি এ বিষয়ে গণমাধ্যম কর্মীদের সহযোগিতা কামনা করেন।
সুবর্ণচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আকিব ওসমান বলেন, কৃষিজমি রক্ষা ও পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে অবৈধভাবে কৃষিজমি থেকে মাটি কাটা এবং কৃষিজমিতে ইটভাটা স্থাপনের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে। কেউ আইন অমান্য করলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, কৃষিজমি যাতে ইটভাটার কাঁচামাল সংগ্রহ কিংবা ভাটা স্থাপনের কাজে ব্যবহার না হয়, সে বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের নজরদারি অব্যাহত থাকবে।
অভিযানটি সহকারী কমিশনার (ভূমি) ছেনমং রাখাইনের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়। এ সময় পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক রায়হান মোর্শেদ, চরজব্বর থানা-পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের প্রতিনিধিসহ উপজেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
কার্যকর নজরদারির দাবিঃ
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা জরুরি। কোনো ইটভাটা ভেঙে দেওয়ার পর একই স্থানে বা অন্যত্র পুনরায় কার্যক্রম শুরু হচ্ছে কি না, সেটিও পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি অভিযোগের ভিত্তিতে অন্যান্য ইটভাটার কাগজপত্র যাচাই করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
সুবর্ণচরে কৃষিজমি রক্ষা ও পরিবেশদূষণ নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের সাম্প্রতিক অভিযান কতটা স্থায়ী ফল বয়ে আনে, তা নির্ভর করবে ধারাবাহিক নজরদারি, আইন প্রয়োগ এবং অভিযোগগুলোর কার্যকর তদন্তের ওপর। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, মৌসুমভিত্তিক বিচ্ছিন্ন অভিযানের পরিবর্তে অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে নিয়মিত ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যাতে কৃষিজমি ও পরিবেশের ক্ষতি রোধ করা যায়।



Post Comment