নোয়াখালীর সংরক্ষিত বন উজাড়ে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ, রেঞ্জ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্তের দাবি
নোয়াখালী প্রতিনিধি:
নোয়াখালীর উপকূলীয় অঞ্চল হাতিয়ার সাগুরিয়া রেঞ্জের সংরক্ষিত বনভূমি দখল, বন উজাড় এবং বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে রেঞ্জ কর্মকর্তা মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের অভিযোগ, অর্থের বিনিময়ে সংরক্ষিত বনভূমি দখল, গাছ কেটে বসতভিটা নির্মাণ, দোকানঘর স্থাপন এবং কৃষিকাজের সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে মধু আহরণ ও খাল ইজারা নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সংরক্ষিত বনাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে গাছ কেটে জমি পরিষ্কার করা হয়েছে। কোথাও নতুন ভিটা নির্মাণ, কোথাও বসতি স্থাপন, আবার কোথাও কৃষিকাজ চলছে।
বুড়িরচর ইউনিয়নের আলাদিগ্রাম বাজারের দক্ষিণ পাশে চরআলিম বেড়িবাঁধ সংলগ্ন এলাকায় প্রায় ১০০ একর বনভূমি ধাপে ধাপে উজাড় করে বসতি স্থাপন করা হয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি। তাদের ভাষ্য, সম্প্রতি এস্কেভেটর ব্যবহার করে একাধিক ভিটা নির্মাণ করা হয়েছে এবং সেখানে দ্রুত ঘর তোলা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এসব ভিটার জন্য নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে, যা বন বিভাগের সংশ্লিষ্টদের মাধ্যমে রেঞ্জ কর্মকর্তার কাছে পৌঁছেছে। নির্বাচনের পরদিনও বনভূমির ভেতরে অর্থের বিনিময়ে নতুন ভিটা ও ঘর নির্মাণের ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করেন তারা।
আলাদিগ্রাম বাজারের পশ্চিম পাশে প্রায় ২০ একর বনভূমি দখল করে চাষাবাদের অভিযোগও পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের মতে, প্রভাবশালী একটি চক্র বন ও ভূমি বিভাগের কিছু অসাধু ব্যক্তির সহযোগিতায় বনভূমি দখল করে ভূমিহীনদের কাছে বিক্রি করছে।
এদিকে টানবাজার দক্ষিণ পাশের চরআলিম-লালচর সড়ক সংলগ্ন এলাকায় বন কেটে আড়াই একর জমিতে রাতারাতি বসতবাড়ি নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, নির্মাণকাজ শুরুর আগে বন বিভাগের সঙ্গে অর্থ লেনদেনের চুক্তি হয় এবং এরপর আর কোনো বাধা দেওয়া হয়নি।
একই এলাকায় প্রায় ৫০টি গাছ কেটে জায়গা পরিষ্কার করার ঘটনাও দেখা গেছে। এছাড়া পূর্বে উচ্ছেদ করা তিনটি দোকানঘর পুনর্নির্মাণের অভিযোগও উঠেছে।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, চরআলিম বিট সরাসরি রেঞ্জ কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে থাকায় এসব অনিয়ম সংঘটিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া বনাঞ্চলের মধু আহরণ ও বিভিন্ন খালের ইজারা কার্যক্রমেও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে সাগুরিয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বলেন, “আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ পুরোপুরি সত্য নয়। বন রক্ষায় মাঠপর্যায়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত স্টাফরা কাজ করছেন।”
এ বিষয়ে নোয়াখালী উপকূলীয় বন বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা মন্তব্য করতে রাজি হননি।
উপকূলীয় অঞ্চল বন সংরক্ষক মোল্যা রেজাউল করিম বলেন, “অভিযোগগুলো তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
উল্লেখ্য, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে হেল্প প্রকল্পের আওতায় চরআলিমে ১০০ হেক্টর এবং ভাসানচরে ৩২০ হেক্টর ম্যানগ্রোভ বন সৃজনের দায়িত্ব পায় সাগুরিয়া রেঞ্জ। তবে স্থানীয়দের দাবি, সরেজমিনে প্রকল্পভুক্ত অনেক এলাকায় বনের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি।
পরিবেশবাদী ও স্থানীয় সচেতন মহলের আশঙ্কা, বনভূমি দখল, অবৈধ বসতি স্থাপন ও প্রশাসনিক অনিয়ম অব্যাহত থাকলে উপকূলীয় পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং সরকারি সংরক্ষিত সম্পদ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।



Post Comment