নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে সুবর্ণচরে তিন শতাধিক মানুষের শপথ গ্রহণ
সুবর্ণচর( নোয়াখালী) প্রতিনিধি:
ঝড়—বৃষ্টি আবহাওয়ার বৈরিতা উপেক্ষা করে নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে আজ শপথ নিয়েছে নারী—পুরুষ, তরুণ, শিক্ষার্থী, জনপ্রতিনিধিসহ সুবর্ণচরের তিন শতাধিক মানুষ।
বিশ্বব্যাপী চলমান কর্মসূচি নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ পক্ষের অংশ হিসেবে আজ সোমবার ৬ ডিসেম্বর, ২০২১ সূবর্ণচর পাংখার বাজার উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে এক উন্মুক্ত সংলাপ আয়োজিত হয়। উন্নয়ন সংগঠন পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাকশান নেটওয়ার্ক—প্রান, নিজেরা করি এবং বন্ধন এর যৌথ উদ্যোগে এবং একশনএইড বাংলাদেশ ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল এর সার্বিক সহায়তায় ‘নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে উন্মুক্ত সংলাপ’ শীর্ষক এই সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠনে অতিথি হয়ে যোগ দেন চর জব্বর থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা(ওসি) মো. জিয়াউল হক, সুবর্ণচর উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান সালমা চৌধুরী, পাংখার বাজার উচ্চ বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষক আক্তার হোসেন বাবুল প্রমুখ। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাকশান নেটওয়ার্ক— প্রান এর প্রধান নির্বাহী নুরুল আলম মাসুদ।
সমবেত জাতীয় সংগীত এর মধ্যে দিয়ে শুরু হয় উন্মুক্ত সংলাপ।
নারীর প্রতি চলমান সহিংসতার কারণ, করণীয় ও প্রতিকার বিষয়ে অংশগ্রহণকারী ও অতিথিদের মধ্যে নানা প্রশ্নোত্তরের মধ্যে দিয়ে এই সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়।
অংশগ্রহণকারীরা বলেন, এখানে নারীর প্রতি সহিংসতার মূল বিষয়গুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে যৌতুক, বাল্যবিবাহ। প্রায়শই দেখা যায় জন্ম নিবন্ধনের ক্ষেত্রে বয়স নিয়ে মিথ্যে রেজিস্টে্রশন হয়। চলমান করোনা মহামারীতে এখানে বাল্যবিবাহের ঘটনা আশংকাজনকভাবে বেড়েছে। অনেক সময় প্রশাসনের সহায়তায় বিয়ের আয়োজন বন্ধ করা গেলেও কোর্টে গিয়ে এই আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়। তারা আরো বলেন এই অঞ্চলে এক ধরণের না, অন্যান্য অনেক ধরণের নিপীড়ন ও আছে যা অধিকাংশ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক। এগুলো নিয়ে প্রশ্ন তোলা এখন সময়ের দাবি। মামলার দীর্ঘসূত্রিতার কারণে অনেক নারীরা মামলা করতে চান না। ফলে অনেকেই আইনী সহায়তা নেয়া থেকে পিছিয়ে যায়। তারা আরো বলেন – ‘নারীর প্রতি কোনো রকমের সহিংসতা হলে আমরা এলাকার মুরুব্বিদের কাছে যাই। তারা আইনী সহায়তা নিতে বললে পরে দেখা যায় কোনো তদন্তে এলাকার কেউ কথা বলেন না। এক্ষেত্রে আরো জটিলতা তৈরি হয়’।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন নারী অংশগ্রহণকারী বলেন, নারীদের জন্য প্রধান বাধা তৈরি করে সমাজ— নারীদের আসলে কোনো কথা বলতে দেয়া হয়না। সহিংসতা, নিপীড়নের কথা বলতে গেলে আবারো নিপীড়নের শিকার হতে হয়, এই সহিংসতার তীব্রতা প্রথমবারের চেয়েও বেশী হয় কখনো কখনো।
এছাড়াও বক্তারা নারী নির্যাতন হলে প্রশাসন তাদের তাৎক্ষনিক কী ধরণের সহায়তা করতে পারেন সে বিষয়ে প্রশ্ন করেন।
পাংখার বাজার উচ্চ বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষক আক্তার হোসেন বাবুল বলেন— অনেক সময় স্কুলে বাচ্চারা এলে মন খারাপ করে বসে থাকে। তাদের প্রশ্ন করলে জানা যায় বাবার বহুবিবাহ বা তালাকের কারণে নানা পারিবারিক অশান্তি হচ্ছে। আবার বহুবার আমরা পুলিশ প্রশাসনের সহায়তা নিয়ে বাল্যববাহ বন্ধ করেছি। কিন্তু অন্য কোনো না কোনোভাবে বিয়েটি পরে হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে জানানো হয়েছে তারা বয়স বাড়ানোর বিষয়টি নিয়ে কাজ করবেন না, এতেও অনেক বাল্যবিবাহ কমিয়ে আনা গেছে। কিন্তু সার্বিকভাবে আমাদের জানার অভাব আছে, দেশের নীতি, আইনগুলো আমাদের নিয়ে অনেক বেশী জানা প্রয়োজন। সংহতি বক্তব্যে শিক্ষা দীক্ষার প্রসার, মানবাধিকার এবং নারী অধিকার কর্মসূচির মাধ্যমে এই অঞ্চলে নারী নির্যাতন কমিয়ে আনার আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
সুবর্ণচর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ার সালমা চৌধুরী বলেন, একজন নারীকে আঘাত করা মানে গোটা পরিবারকে আঘাত করা। সমাজ পরিবারের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর অবদান অপরিসীম হলেও তার স্বীকৃত সেভাবে নেই। নারীর প্রতি নির্যাতনের যে কোনো ঘটনায় সরাসরি প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের শরনাপন্ন হবার আহবান জানান তিনি।
চর জব্বর থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা(ওসি) মো. জিয়াউল হক বলেন, নারীর প্রতি সহিংসতার প্রধান কারণ সহিংসতার ঘটনা প্রকাশ করতে না পারাটা। যে পরিবারে বাল্যবিবাহ, যোউতুক, সহিংসতা,নিপীড়ন হয়ে হয় সেই পরিবারে মা থাকেন, পরিবারে অন্যান্য নারীরাও থাকেন। নারীর প্রতি সহিংসতার জন্য এই কাছের মানুষেদের অজ্ঞতাও দায়ী। একটি সমীক্ষা বলে নারীর প্রতি নির্যাতনের ৮৭ শতাংশ হয় নারীর নিজের ঘরে। প্রশাসন আইনী বিষয়গুলো অবশ্যই দেখবে কিন্তু কিন্তু নিজের ঘরে নির্যাতিত হবার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হলে নিজেদের সচেতন হবার বিকল্প নেই। এফিডেভিট দিয়ে বিয়ের কাজ সম্পন্ন করার বিষয়ে তিনি বলেন, এটি কেবল একটি অঙ্গীকারনামামাত্র, কোনো বিবাহ না। অনেক সময় দায়িত্বশীল মানুষ নিজেরাই এই সব কাজে জড়িত হয়ে পড়েন। আসলে নারীর জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই কমবেশি সহিংসতা ঘটে, আমরা হয়তো তা বুঝতে পারিনা, বা তা নিয়ে কথা বলিনা। আর যতক্ষণ আমরা কথা না বলবো, ততক্ষণ সহিংসতা হবে। সকল ধরণের সহিংসতা বন্ধ করতে আমাদের পারিবারিক শিক্ষা এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।
নুরুল আলম মাসুদ বলেন, সুবর্ণচর অঞ্চলের ভূমি লড়াইয়ে সবচেয়ে বড় আহতের সংখ্যা নারী, অবদান ও নারীরই বেশী। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে নারীর প্রতি সহিংসতা কমেনি বরং বেড়েছে। আলোচনায় উঠে আসে এখানকার অধিকাংশ মানুষ এখানে হটলাইন নাম্বার জানেন না, যারা জানেন তারাও কখনো হটলাইন ব্যবহার করে নিপীড়ন বন্ধে আইনী সহায়তা চাননি।
ভূমিহীন আন্দোলন নেত্রী মেরিনা আক্তার বলেন— আমরা অনেকেই নিজে নির্যাতনের শিকার হয়ে দেখা যাচ্ছে নিজের ছেলে তার স্ত্রীকে নির্যাতন করলেও আর বাধা দেই না। সহিংসতাকে আমরা স্বাভাবিক বলে ধরে নিয়েছি। যৌতুকের মত পারিবারিক নির্যাতন হচ্ছে এক ধরণের লোভের ফসল। যত প্রশ্রয় দেয়া হয় তত বাড়ে। নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ করতে নারীদের স্বাবলম্বী হবার বিকল্প নেই।
সুবর্ণচর উপজেলার দুই শতাধিক নারী পুরুষ, তরুণ, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, জনপ্রতিনিধি, নোয়াখালীতে কমর্রত উন্নয়ন সংগঠন এনআরডিএস, সাগরিকা, দ্বীপ উন্নয়ন সংস্থা, এসো গড়ি উন্নয়ন সংস্থা, প্রচেষ্টা নারী উন্নয়ন মেলা, এফপিএবি, নোয়াখালী নারী অধিকার জোট, গান্ধী আশ্রম ট্রাস্ট, এসডিপি, পারিবারিক নিযাতন প্রতিরোধ জোট, দুর্যোগকালীন নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোর্ধ—প্রতিবাদ করি, প্রতিরোধ গড়ি এই এয়োজনে সহউদ্যোক্তা হিসেবে অংশ নেন।
জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধে ব্যক্তিগত এবং ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার শপথের মধ্যে দিয়ে এই আয়োজন সমাপ্ত হয়।
বিগত বছরগুলোতে নারীর প্রতি বিভিন্ন সময়ে সহিংসতার ঘটনায় সুবর্ণচর উলে¬খযোগ্য সংখ্যকবার আলোচনায় এসেছে। নারীর প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গী বদলে দিতে এবং সহিংসতামুক্ত সংস্কৃতিচর্চা তৈরি ক্যাম্পেইনের অংশ হিসেবে ২০১৯ এবং ২০২০ সালেও পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যাকশান নেটওয়ার্ক—প্রানের আয়োজনে সুবর্ণচরে বহুপাক্ষিক সংলাপ আয়োজিত হয়।



Post Comment