সুবর্ণচর উপজেলায় বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার নেই

মুজাহিদুল ইসলাম সোহেল


নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলায় বেশির ভাগ প্রাথমিক মাধ্যমিক ও মাদরাসায় শহীদ মিনার নেই। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনোটিতে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে বাঁশ কিংবা কলাগাছ সাদা কাপড় মুড়িয়ে অস্থায়ীভাবে (কৃত্রিম) শহীদ মিনার বানিয়ে দিবসটি পালন করা হয়। আবার কোনো প্রতিষ্ঠানে দিবসটি পালনই করা হয় না।

সুবর্ণচর উপজেলা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় ৯৩টি সরকারি প্রাথমিক,২৪টি বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় , ২৬টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ৭টি কলেজ ও ১৫টি মাদ্রাসা আছে। এ ছাড়া রয়েছে ৮টি কিন্ডারগার্টেন।

সরকারী বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে শুধুমাত্র ১টিতে শহীদ মিনার আছে। ২৬টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে শহীদ আছে ৭টিতে আর ৭টি কলেজে ২টিতে আছে শহীদ মিনার। তবে বিস্ময়কর ব্যাপার, উপজেলার ১৫টি মাদ্রাসার কোনোটিতেই শহীদ মিনার নেই। তাই সব মিলিয়ে এবারও এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শত শত শিক্ষার্থী নিজ প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনারের অভাবে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে পারবে না।

কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উপজেলা সদর থেকে ১৭ কিলোমিটার দূরে পূর্ব চরবাটা এমএ কামাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ছাড়া আর কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার নেই। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস এলে বাকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কোনো কোনোটিতে অস্থায়ীভাবে শহীদ মিনার বানিয়ে কিংবা উপজেলা পরিষদ শহীদ মিনারে শ্রদ্ধাঞ্জলি দেওয়া হয়। কোনো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার না বানিয়ে শুধু আলোচনা সভা বা মিলাদ মাহফিল করে দিবসটি শেষ করেন।

মোহাম্মদপুর ইউনিয়নের চর আক্রাম সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সম্প্রতি গিয়ে দেখা যায়, সেখানে কোনো শহীদ মিনার নেই। ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নুর আলম বলেন, ‘কোন ধরনের বরাদ্দ না থাকায় অর্থের অভাবে প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার তৈরি করতে পারিনি। মোহাম্মদপুর ইউনিয়নের সাবেক ও বর্তমান চেয়ারম্যানকে বলেছিলাম। তাঁরাও শহীদ মিনার নির্মাণ করে দেননি। তাই একুশে ফেব্রুয়ারি এলে স্কুলের মাঠে অস্থায়ী শহীদ মিনার বানিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে হয়।’

চর জিয়া উদ্দিন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ইখতিয়ার উদ্দিন ফারুক বলেন, শহীদ মিনার নেই। তাই একুশে ফেব্রুয়ারির আগের দিন বিদ্যালয়ের মাঠে কলাগাছের শহীদ মিনার বানানো হয়।

পাংখার বাজার উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আক্তার উদ্দিন বাবুল বলেন, ‘উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের কাছে সহযোগিতা চেয়েছি, তিনি শহীদ মিনার নির্মাণ করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।’

দক্ষিণ কচ্ছপিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র রিয়াসাত আলম বলে, ‘একুশে ফেব্রুয়ারির দিন ইশকুল ছুটি থাকে। আঙ্গো স্যারেরা স্কুলে আসে আমরাও আসি ফুল দি না।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজনের) উপজেলা সাধারণ সম্পাদক আব্দুল বারী বাবলু বলেন, বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। স্বাধীনতার ৫২ বছরেও অনেক প্রতিষ্ঠানে একটি মানসম্মত শহীদ মিনার নির্মাণ হয়নি। আজ আমরা যে ভাষায় কথা বলি সেই মাতৃভাষাকে বাংলা করতে যারা শহীদ হয়েছিল, আজ তাদের শ্রদ্ধা জানানোর মত কোন শহীদ মিনার নেই। এটি একটি লজ্জাজনক বিষয়। তাই দ্রুত সময়ের মধ্যে একটি মানসম্মত শহীদ মিনার নির্মাণের দাবি জানান তিনি।

এ বিষয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল মোবারক বলেন, যেই দিবসটিকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, অথচ সেই দিবসে ভাষা শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর জন্য বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে কোন শহীদ মিনার নেই।

ভারপ্রাপ্ত প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আবু জাহের বলেন, সম্প্রতি জেলা প্রাথমিক অফিস থেকে শহীদ আছে কি নেই সে বিষয়ে একটি তথ্য চাওয়া হয়েছে আমরা সে অনুযায়ী তথ্য প্রেরণ করেছি। তবে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার নির্মাণ করার মতো অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয় না। আর বরাদ্দ না পেলে আমরা কীভাবে শহীদ মিনার নির্মাণ করে দেব। তবে শিশু শিক্ষার্থীদের ইতিহাস সচেতন করতে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার নির্মাণ জরুরি।

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মুহম্মদ শহিদুল করিম বলেন‘ সুবর্ণচরে ২৬টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও ১৫টি মাদরাসা রয়েছে। এগুলোর মধ্যে মাধ্যমিকে ৭টি শহীদ মিনার রয়েছে । গত বছর জেলা শিক্ষা অফিস থেকে একটি তালিকা চাওয়া হয়েছে সে অনুযায়ী তালিকা প্রেরণ করা হয়েছে।

উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এএইচএম খায়রুল আনম চৌধুরী সেলিম বলেন, এই মুহূর্তে কোন বরাদ্দ নেই তবে পরিকল্পনা করে পর্যায়ক্রমে সব প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার নির্মাণ করে দেওয়া হবে।

Post Comment

You May Have Missed

error: অনুমতি ছাড়া লিখা ও ছবি নকল করা নিষেধ