লাতিন আমেরিকার দেশগুলো স্কুল বেশি বন্ধ রেখেছে

সুবর্ণসময় ডেস্ক::


পানামার আট বছরের শিশু ব্রিথানির এক বছর ধরে পড়াশোনা প্রায় বন্ধ। এই এক বছর স্কুল বন্ধ থাকায় ক্লাস হয়নি। অনলাইন ক্লাসও সহজে করা যায়নি। ব্রিথানির মতো পানামার ৮ লাখ ৯০ হাজার শিশুর শিক্ষাজীবন করোনার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

জাতিসংঘের শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) বলছে, ২০২০ সালের মার্চ মাস থেকে এ বছরের মার্চ পর্যন্ত গত এক বছরে ১৪টি দেশে স্কুল বন্ধ রয়েছে। এসব দেশের দুই-তৃতীয়াংশই লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় দেশ।

ইউনিসেফের হিসাবে, করোনা মহামারিতে বিশ্বে ১৬ কোটি ৮০ লাখ শিশু ক্ষতির শিকার। এর মধ্যে লাতিন আমেরিকার শিশু ৯ কোটি ৮০ লাখ। সেখানে বছরে গড়ে ১৯০ দিনের মধ্যে শিশুরা ১৫৮ দিনই স্কুলে ক্লাস করতে পারেনি।

ইউনিসেফ জানিয়েছে, ১৪ দেশের মধ্যে পানামা বেশির ভাগ সময় স্কুল বন্ধ রেখেছে। এরপর বেশি সময় ধরে স্কুল বন্ধ রয়েছে এল সালভাদর, বাংলাদেশ ও বলিভিয়াতে। এ বছর ইকুয়েডর ও পেরুতে স্কুলে ক্লাস শুরু হতে যাচ্ছে।

ইউনিসেফ বলছে, বিশ্বে ২১ কোটি ৪০ লাখ শিশু অথবা প্রতি সাতজনে একজন তিন-চতুর্থাংশের বেশি ক্লাস করতে পারেনি। ইউনিসেফ আরও বলেছে, বিশ্বে ৩০ লাখ শিশু স্কুল থেকে ঝরে পড়তে পারে। তাদের এ হিসাবের সত্যতা মেলে ব্রিথানির কথায়।

ব্রিথানির মা মিলেনা মেলদোসা ঘরবাড়ি পরিষ্কারের কাজ ও নানা পণ্য বিক্রি করে সংসার চালান। তিনি সিঙ্গল মাদার। মায়ের মুঠোফোনে খুব কমই অনলাইন ক্লাসে যোগ দেওয়ার সুযোগ পায় ব্রিথানি। কোনো দিন হয়তো অনলাইন ক্লাস বাতিল হয়। কোনো দিন আবার ফোনে নেটওয়ার্ক থাকে না। ব্রিথানির তখন আর পড়া হয় না।
ব্রিথানির মা মেলদোসা এএফপিকে বলেন, ঘরে বসে মেয়ের পড়াশোনার জন্য স্কুল তাঁকে অনেক শিক্ষা উপকরণ কিনতে বলেছে। কিন্তু এত কিছু সামাল দেওয়াটা তাঁর পক্ষে কঠিন।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণের আশঙ্কায় পানামায় বেশির ভাগ স্কুল বন্ধ রাখা হয়েছে। দেশটিতে বেশির ভাগ জায়গায় হাত ধোয়ার জন্য যথেষ্ট পানি নেই। টিকাদান কর্মসূচিও জোরদার নয়। গবেষণার ভিত্তিতে ইউনিসেফ বলছে, শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাই নয়, শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য স্কুলগুলো অবশ্যই খুলে দিতে হবে।
ইউনিসেফের লাতিন আমেরিকাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ রুথ কাস্টোডে এএফপিকে বলেন, তারা রেস্তোরাঁ, শপিং মল, ক্যাসিনো, সিনেমা হল সব খুলে দিয়েছে। শুধু স্কুল বন্ধ রেখেছে। এটা ঠিক নয়। তিনি বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি স্কুল খুলে দেওয়া খুবই জরুরি। স্বাস্থ্যসুরক্ষা, সামাজিক দূরত্ব ও মাস্ক পরার ব্যবস্থা রেখে স্কুলগুলো খুলে দিতে হবে।’

রুথ কাস্টোডে আরও বলেন, স্কুলগুলোতে শিশুরা পুষ্টিকর খাবার পায়। যদি তারা স্কুলে না যায়, তাহলে রোগ প্রতিরোধক্ষমতার ওপরও প্রভাব পড়তে পারে। তিনি আরও বলেন, স্কুলে না যাওয়ার কারণে সহিংসতার ঘটনাও বাড়ছে। যৌন হয়রানি ও কৈশোরে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ার মতো ঘটনা ঘটছে। সহিংসতার শিকার হয়ে অনেক শিশু আত্মহত্যা করতে বাধ্য হচ্ছে।

দরিদ্র ও গ্রামাঞ্চলে অভিবাসী এবং প্রতিবন্ধী শিশুরা ঘনিষ্ঠজনদের কাছে বেশি সহিংসতার শিকার হচ্ছে। করোনাভাইরাস মহামারিতে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন কাস্টোডে।

ইন্টারনেট সহজলভ্য হলেও অনেক অভিভাবক সন্তানের সামাজিকীকরণ নিয়ে উদ্বিগ্ন। পানামার স্যান ফ্রান্সিসকো এলাকায় পাঁচ বছরের শিশু রাফায়েল অনলাইনে ক্লাসের মাধ্যমে শিক্ষাজীবন শুরু করেছে। তবে রাফায়েলের সামাজিকীকরণ নিয়ে চিন্তিত তার মা। রাফায়েলের মা অ্যানা মারিয়া আরেইজা বলেন, স্কুল থেকে ফিরে বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করত রাফায়েল। এখন সে ছোট স্ক্রিনে বন্ধুকে চিনতে পারে না। মাকেও আর কোনো গল্প বলে না। তাঁর উদ্বেগ যে অমূলক নয় তার প্রমাণ মেলে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ এনরিক রুইদিয়াজের বক্তব্যে। তিনি বলেন, মেলামেশা না করলে শিশুদের মধ্যে আচরণগত নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে।

পানামার শিক্ষামন্ত্রী মারুজা গোর্দে এএফপিকে বলেন, সুরক্ষাব্যবস্থা মেনে স্কুলগুলো খুলে দেওয়া হবে।

Post Comment

You May Have Missed

error: অনুমতি ছাড়া লিখা ও ছবি নকল করা নিষেধ