► সময়ের ব্যবধানে বহুমুখী সংকটে বিচার ► বাদী ও গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীরা মারা গেছেন: বিচার মেলেনি ৫০ বছরেও

মামলার নথি এখনো সচল আছে, কিন্তু বাদী ও গুরুত্বপূর্ণ অনেক সাক্ষী বেঁচে নেই। একসময়ের বহুল আলোচিত বিটিভির চার কর্মকর্তা হত্যা মামলাটি ৫০ বছর পেরিয়ে এখন বহুমুখী সংকটে পড়েছে। দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে কয়েকজন আসামি, বাদী ও গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীর মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে জামিনে থাকা চার আসামি এখনো পলাতক। ফলে বিচারকাজ বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

তবুও মামলাটি আদালতে সচল থাকায় সম্প্রতি সাক্ষীদের আদালতে হাজির হতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে মামলার বাদী মনোয়ারা আকমল খান ২০০৪ সালের আগেই মারা গেছেন। এ ছাড়া বেশ কয়েকজন সাক্ষীকে তাদের ঠিকানায় খুঁজে পাওয়া যায়নি বলে পুলিশ আদালতকে জানিয়েছে। সময়ের দীর্ঘ ব্যবধান, আইনি জটিলতা ও সাক্ষীসংকটের কারণে মামলার বিচার শেষ হবে কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

মামলার নথি থেকে জানা যায়, ১৯৭৫ সালের শেষ দিকে বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী কল্যাণ সমিতির আন্দোলন চলছিল। দাবি-দাওয়া পূরণ না হওয়ায় আন্দোলনকারীরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন। একই বছরের ৬ নভেম্বর রাতে আন্দোলনকারীরা কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে আটকে রেখে দাবি আদায়ের সিদ্ধান্ত নেন। পরদিন ৭ নভেম্বর সকালে বিটিভির ডিরেক্টর অব প্রোগ্রাম মনিরুল আলম, চিফ অ্যাকাউন্টস অফিসার আকমল হোসেন এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তা এ এফ এম সিদ্দিক অফিসে এলে তাদের টেলিভিশন ভবনের ভিতরে নিচতলার ১০১ নম্বর কক্ষে আটকে রাখা হয়। একই দিন বিকালে ক্যামেরাম্যান চৌধুরী মো. ফিরোজ কাইয়ুমকেও সেখানে আটক করা হয়। পরিবারের সদস্যদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের ছেড়ে দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়। কিন্তু ওই রাতেই চার কর্মকর্তাকে একটি গাড়িতে করে অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হয়। মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, পরে তাদের হত্যা করে বিটিভি ভবনের পেছনের খালে, বর্তমান হাতিরঝিল এলাকায় লাশ ফেলে দেওয়া হয়। ঘটনার পর তাদের খোঁজ না পেয়ে ১৯ নভেম্বর গুলশান থানায় অপহরণ মামলা করেন স্বজনরা। পরে ১৯৭৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি খালের পানি শুকিয়ে গেলে চারটি কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়। পরনের পোশাক ও ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে কঙ্কালগুলোর পরিচয় শনাক্ত হয়।

তদন্ত শেষে ১৯৭৮ সালের জানুয়ারিতে তৎকালীন গোয়েন্দা পুলিশ ‘ঘটনার কোনো রহস্য উদ্ঘাটন করা সম্ভব হয়নি’ উল্লেখ করে আদালতে মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। আদালত সেই প্রতিবেদন গ্রহণ করলে মামলার কার্যক্রম কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। পরে নিহত আকমল হোসেনের স্ত্রী মনোয়ারা আকমল খানের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯৭ সালের ২০ জানুয়ারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে মামলাটি পুনঃতদন্ত শুরু হয়। একই বছরের ২৫ মার্চ আদালত মামলা পুনঃতদন্তের জন্য সিআইডিকে নির্দেশ দেন। পুনঃতদন্ত শেষে সিআইডির তৎকালীন সহকারী পুলিশ সুপার ফজলুল করিম খান ১৯৯৯ সালের ১৮ আগস্ট নয়জনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন।

২০০২ সালে মামলাটি বিচারের জন্য ঢাকার প্রথম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে পাঠানো হয়। এর মধ্যে আসামি আইনুজ্জামান মারা যাওয়ায় ২০০৩ সালে তৎকালীন বিচারক মো. সিরাজুল ইসলাম আট আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। আসামিরা হলেন, মো. শাজাহান সিরাজী, আবুল কাশেম বানেজা, লুৎফর রহমান তালুকদার, আলতাফ হোসেন, আবদুল আউয়াল সরকার, এ কে এম জাকারিয়া হায়দার, আবুল কাশেম ও সৈয়দ আইনুল কবির। তবে ২০০৪ সালে আসামি আলতাফ হোসেন হাই কোর্টে মামলা বাতিলের আবেদন করলে ২০০৫ সালে বিচার কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যায়। দীর্ঘদিন পর হাই কোর্ট রুল খারিজ করে দিলে মামলার বিচার আবার শুরু হয়। বর্তমানে মামলাটি ঢাকার প্রথম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন। সম্প্রতি সংশ্লিষ্ট আদালতের বিচারক মো. আলমগীর গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের দ্রুত আদালতে হাজির করার নির্দেশ দিয়েছেন। আগামী ১৯ আগস্ট সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য রয়েছে। এ বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেন জানান, নয় আসামির মধ্যে চার আসামির মৃত্যুর তথ্য মামলার নথিতে রয়েছে। বর্তমানে চার আসামি জামিনে থেকে পলাতক। মাত্র একজন আসামি নিয়মিত আদালতে হাজিরা দিচ্ছেন। আশা করি খুব দ্রুত এ মামলা নিষ্পত্তি হবে।

Post Comment

You May Have Missed

error: অনুমতি ছাড়া লিখা ও ছবি নকল করা নিষেধ