অভিনেতা আবদুল করিমের আক্ষেপ: আমি ব্যান চালাই, তাই কি অভিনয় করতে পারি না?” — প্রশ্ন আবদুল করিমের
সুবর্ণচরের মাটি থেকে সংস্কৃতির দীপ্ত আলো: ব্যান চালক আবদুল করিমের স্বপ্ন ও সংগ্রাম
বিনোদন প্রতিবেদন
সংস্কৃতি কোনো পেশাগত পরিচয়ের গণ্ডিতে আটকে থাকে না—এ প্রমাণ দিয়েছেন নোয়াখালীর সুবর্ণচরের ব্যান চালক ও অভিনেতা আবদুল করিম। পেশায় তিনি একজন সাধারণ ব্যান চালক হলেও মনের মধ্যে লালন করেন এক অসাধারণ সাংস্কৃতিক চেতনা। বিনা সহায়তায়, নিজের কষ্টার্জিত টাকায় তিনি স্থানীয় নাট্যদল “সুবর্ণ নাট্যদল”-এর সঙ্গে মিলে একযুগেরও বেশি সময় ধরে নাটক ও শর্টফিল্ম নির্মাণ করে যাচ্ছেন ।
আবদুল করিমের আক্ষেপ, “নোয়াখালীতে ‘সুবর্ণ নাট্যদল’ ছাড়া আর কোনো সংগঠন নিয়মিত নাটক ও শর্টফিল্ম নির্মাণ করছে না। অথচ আমরা সরকারি বা বেসরকারি কোনো স্বীকৃতি বা সহযোগিতা পাইনি।” নিজের শিক্ষাগত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তিনি বলেন, “আমি ব্যান চালক, কিন্তু সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা আমাকে নাটকের সঙ্গে জড়িয়ে রেখেছে।”

তবে তার এই স্বপ্নপথ সহজ ছিল না। ব্যান চালানোর পাশাপাশি অভিনয়ে যুক্ত হওয়ায় স্থানীয় অনেকের কাছ থেকে কটু কথা ও অবজ্ঞা সহ্য করতে হয়েছে তাকে। “অনেকে বলে আমি ব্যান চালাই, নাটক করি কেন? রাস্তার ছেলে টিভিতে বা ইউটিউবে কেন থাকবে?” — এইসব কথা শুনে তার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়। তবুও থেমে যাননি তিনি।
তার এই যাত্রায় সবচেয়ে বড় সহায়তা করেছেন নাট্যনির্মাতা জিসান রহমান, যার হাত ধরে আবদুল করিম প্রথম অভিনয়ের সুযোগ পান। “জিসান ভাই শুধু আমাকে না, অনেক সাধারণ মানুষকে অভিনয়ের সুযোগ দিয়েছেন। তিনি নিজেও সমাজের শিক্ষিত গোষ্ঠীর সমালোচনার শিকার হন, তবুও থামেননি,” বলেন করিম।
সুবর্ণ নাট্যদলের অন্যান্য সদস্যরাও আবদুল করিমের মতোই নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।

সাধারণ সম্পাদক সোহাগ আহম্মদ বলেন, “আমরা নিজের টাকায় নাটক বানাই, কারো সাহায্য ছাড়াই। স্থানীয় ও জাতীয় মিডিয়ায় আমাদের প্রচার খুবই সীমিত।”
অভিনেত্রী রুপা আক্তার জানান, “আমরা চাই সবাই আমাদের কাজ দেখুক, সমালোচনা করুক, কিন্তু পাশে থাকুক।”

তানবেহা ইসলাম পপি বলেন, “গ্রামাঞ্চলে থেকেও যে শিল্পচর্চা করা যায়, তা আমরা প্রমাণ করতে চাই।”
এদিকে ছোট্ট শিল্পী জান্নাতুল মারিয়া বলে, “আমি বড় হয়ে অভিনেত্রী হতে চাই, যেমন নাটকে অভিনয় করি, তেমন বড় পর্দায়ও কাজ করতে চাই।”
সুবর্ণচর একটি প্রত্যন্ত এলাকা হলেও এখানকার শিল্পীদের মধ্যে স্বপ্ন ও সক্ষমতার কোনো ঘাটতি নেই। শুধু প্রয়োজন সম্মান ও সহযোগিতার। স্থানীয় প্রশাসন, সাংস্কৃতিক অঙ্গনের ব্যক্তিত্ব ও সংবাদমাধ্যম যদি এগিয়ে আসে, তবে “সুবর্ণ নাট্যদল”-এর আলো সারা দেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
সংস্কৃতি শুধুই শহরের নয়—প্রান্তিক মানুষদের কণ্ঠেও রয়েছে জীবনের গল্প, আবেগ ও প্রতিভা। সেসব গল্প যেন হারিয়ে না যায় ব্যানগাড়ির শব্দে।



Post Comment