নুরুল হুদাকে মনে পড়ে

অয়োময়, সংশপ্তক, কোথাও কেউ নেই, বহুব্রীহি, রূপনগর, আজ রবিবার—বিটিভির জনপ্রিয় ধারাবাহিক নাটকের প্রসঙ্গ এলে এগুলোর কথাই আসে আগে। প্রতিটিই গত শতাব্দীর, যখন বিটিভিই ছিল একমাত্র চ্যানেল। এই শতাব্দীতে বিটিভির অন্যতম জনপ্রিয় ধারাবাহিক অরণ্য আনোয়ারের ‘নুরুল হুদা একদা ভালোবেসেছিল’। ২০ সেপ্টেম্বর, ২০০৪-এ প্রচার শুরু হয়েছিল এটির। দুই দশক পূর্তি উপলক্ষে নুরুল হুদাকে নিয়ে লিখেছেন হৃদয় সাহা

নুরুল হুদা গ্রামের সহজ-সরল ও স্বপ্নবিলাসী যুবক। ভালোবাসে শেফালিকে। বড় ভাইয়ের সংসারে থাকলেও সে স্বপ্ন দেখে একদিন তার অনেক বড় ব্যবসা হবে, পাকা বাড়ি থাকবে, শান-বাঁধানো পাকা ঘাটে ডুবসাঁতার খেলবে। প্রিয়তমাকে নিয়ে মোটরসাইকেল চালিয়ে নাইট শো সিনেমা দেখতে যাবে।

কিন্তু সেই স্বপ্ন সফল হওয়ার আগেই প্রতারিত হয়, সত্মায়ের অত্যাচারে জর্জরিত শেফালির রয়েছে বিয়ে করার তাড়া। ভাগ্য গড়তে নুরুল হুদা পাড়ি জমায় দূর গ্রামে, সেখানে সাপুড়িয়া ওস্তাদ সিদ্দিকের কাছে কাজ শেখে। সিদ্দিকের বউ তার বোন রুম্মানকে বিয়ে করাতে চায় নুরুল হুদার সঙ্গে। কিন্তু নুরুল হুদা তো ভালোবাসে শেফালিকেই।

সাপের দংশনে ওস্তাদের মৃত্যু হলে আবার ফিরে আসে গ্রামে। বিদেশফেরত সোলায়মানের সঙ্গ পেয়ে সে আবার নিজের স্বপ্নপূরণের পথ খোঁজে। ভাগ্যের পরিহাসে বন্ধু সোলায়মানের সঙ্গেই ঠিক হয় শেফালির বিয়ে। ব্যর্থ নুরুল হুদা পাতার বাঁশি বাজাতে বাজাতে দূরে সরে যায়!

১৩ পর্বের ধারাবাহিকটি প্রথম পর্ব থেকেই দর্শকপ্রিয়তা পেতে শুরু করে।

পোড়-খাওয়া নুরুল হুদা চরিত্রে অভিনয় করে তুমুল জনপ্রিয়তা পান মাহফুজ আহমেদ। শেফালি চরিত্রে অভিনয় করে সমাদৃত হন ইপসিতা শবনম শ্রাবন্তী। অভিনেত্রীর তখন ক্যারিয়ারে সুসময় চলছিল। এ নাটকে অভিনয়ের সুবাদে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা আরো বাড়ে। রুম্মান চরিত্রে অভিনয় করে নজর কাড়েন নুসরাত ইমরোজ তিশাও।

ধারাবাহিকটি যখন প্রচারিত হতো, তখন গ্রাম এলাকায় ভীষণ বিদ্যুৎবিভ্রাট হতো। পরিচালক অরণ্য আনোয়ার নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলেছেন, প্রতি পর্ব দেখতে ব্যাটারির ব্যবস্থা করার জন্য ধুম লেগে যেত। পাতার বাঁশি এ নাটকের অন্যতম বিশেষ দিক। নুরুল হুদার পাতার বাঁশিতে ‘কি জাদু করিলা’ গানের সুর দর্শককে মন্ত্রমুগ্ধ করে। বিশেষ করে শেষ দৃশ্যে পাতার বাঁশি বাজাতে বাজাতে নুরুল হুদার রাতের আঁধারে হারিয়ে যাওয়ার দৃশ্যটির কথা দর্শক মনে রেখেছে এখনো।

ধারাবাহিকটির সিক্যুয়াল ‘অতঃপর নুরুল হুদা’। অভিনয়ে নতুনভাবে যুক্ত হন এ টি এম শামসুজ্জামান, আজিজুল হাকিম, তারিন, মীর সাব্বির, মোশাররফ করিম, ইয়ামিন হক ববি। তবে বাদ পড়ে শ্রাবন্তীর করা চরিত্রটি। এটিও প্রথমটির মতো জনপ্রিয়তা পায়। শেষ পর্বটি দুইবার প্রচার করে বিটিভি। পরে অরণ্য আনোয়ার ও মাহফুজ আহমেদ মিলে এই দুই গল্পকে আরো বিশদভাবে চিত্রনাট্য সাজিয়ে নির্মাণ করেন দীর্ঘ ধারাবাহিক ‘আমাদের নুরুল হুদা’। তবে এটি প্রচারিত হয় এটিএন বাংলায়।

দর্শকের কাছে আমি নুরুল হুদার কারিগর

অরণ্য আনোয়ার পরিচালক

‘জনক’ করে প্রথম পরিচিতি পাই, তবে আমার আরো প্রত্যাশা ছিল ধারাবাহিকটি নিয়ে। অনুধাবন করতে পারি, আমার আরো বিশেষ কিছু করতে হবে, যেটার সঙ্গে দর্শক নিজেকে কানেক্ট করতে পারবে। তখনই নুরুল হুদার কথা মাথায় আসে। নুরুল হুদা কোনো নির্দিষ্ট সত্যিকারের মানুষ নয়। এটা সত্য, আমাদের আশপাশে প্রচুর নুরুল হুদার বসবাস। বিশেষ করে আমরা যারা গ্রামে বেড়ে উঠেছি তাদের খুবই পরিচিত। সেই ভাবনা থেকেই চিত্রনাট্য লিখি। টেলিহোম অফিসে মাহফুজ ভাইকে ডাকার পর তিনি এক বসায়ই পুরো পাণ্ডুলিপি পড়েন, রাজিও হয়ে গেলেন। সব কিছু গুছিয়ে হোতাপাড়ায় গিয়ে শুটিং করি। মাহফুজ ভাইয়ের সঙ্গে তারিন, অপি করিমের জুটি তখন জনপ্রিয়। আমার আগের নাটকের নায়িকা ঈশিতা তখন অভিনয়ে অনিয়মিত, তাই তখনকার আরেক জনপ্রিয় অভিনেত্রী শ্রাবন্তীকে নিই। মাহফুজ-শ্রাবন্তীর রসায়ন দর্শক খুব পছন্দ করে। সিরিজে তিশা খুব গুরুত্বপূর্ণ, সে তিনটা সিরিজেই অভিনয় করেছে। সিটিসেলের বিজ্ঞাপনে তিশাকে দেখে তাকে নির্বাচন করি। ও তখন স্কুলছাত্রী, অভিনেত্রী হিসেবে সে তখনই ভীষণ সহযোগিতাপূর্ণ ছিল। ‘জনক’-এর পর নুরুল হুদা দিয়ে মাহফুজ ভাইয়ের সঙ্গে জুটি গড়ে ওঠে, আমরা একসঙ্গে অনেক কাজ করেছি। ২০০৪ থেকে ২০২৪ সাল, এই ২০ বছরে আমাকে দর্শক নুরুল হুদার কারিগর হিসেবেই চেনে। এই ধারাবাহিকের জনপ্রিয়তা আজও অতিক্রম করতে পারিনি, হয়তো সম্ভবও নয়। মাসুম আজিজ ভাইয়ের কথা খুব মনে পড়ছে, আজ তিনি বেঁচে নেই। মনে পড়ছে ফরিদ আহমেদ ভাইয়ের কথাও, যিনি খুব সুন্দর আবহসংগীত করে দিয়েছিলেন।

নুরুল হুদার কাছে আমি আজীবন ঋণী

মাহফুজ আহমেদ অভিনেতা

অভিনেতার জীবন তখনই সার্থক, যখন তাকে তার অভিনীত চরিত্রের নাম ধরে ডাকা হয়। নুরুল হুদা তেমনই একটি চরিত্র। আমাকে দর্শকের হৃদয়ে জায়গা করে নিতে সাহায্য করেছে এই চরিত্র। দর্শক চরিত্রটার প্রতি কী অকৃত্রিম ভালোবাসা দেখিয়েছিল! আসলে মানুষ নুরুল হুদার মতো একজনকে পাশে রাখতে চায়, যে বারবার নিজে ঠকে, কিন্তু অন্যকে ঠকায় না। যতবার হোঁচট খাবে, ততবার স্বপ্ন দেখবে সফল হওয়ার। এই সহজ-সরল আর স্বপ্ন দেখা নুরুল হুদা সবার খুব কাছের কিংবা দর্শকের নিজের চরিত্র হয়ে উঠেছিল। একটা বিশেষ স্মৃতির কথা মনে পড়ছে, একটি দৃশ্যে তিশার একটি কথায় খুব খুশি হয়ে পুকুরে ঝাঁপ দিয়ে সাঁতার কাটি। পরে জানতে পারি, পুকুরের পানি খুব অপরিষ্কার ছিল। এ কারণে পুরো শরীরে র‌্যাশ ওঠে। আমি এতটাই নিমগ্ন ছিলাম যে বুঝে উঠতে পারিনি। প্রচারের পর যখন আলাদা করে সবাই এই দৃশ্যের কথা বলেছিল, আমার অসুস্থতা ভুলিয়ে দিয়েছিল। অরণ্য আনোয়ারকে অনেক ধন্যবাদ, আমাকে এমন একটি চরিত্র দেওয়ার জন্য। শ্রাবন্তীর সঙ্গে আমার তখন পর পর অনেক নাটক জনপ্রিয় হয়েছিল, যদিও পরের সিক্যুয়ালগুলোতে তাকে পাইনি। শ্রাবন্তী খুব আত্মভোলা মানুষ, শুধু নিজের চরিত্রটুকু নিয়েই থাকত। পর্দার নুরুল হুদার মতো আমিও গ্রামে থাকাকালীন পাতার বাঁশি বাজিয়েছি। নুরুল হুদার কাছে আমি আজীবন ঋণী, তাই যেকোনো সময় যদি এই চরিত্র নিয়ে আবার কোনো কিছু নির্মাণ করা হয় আমি সানন্দে রাজি হব।

নুরুল হুদা সমগ্র

নুরুল হুদা একদা ভালোবেসেছিল

রচনা ও পরিচালনা—অরণ্য আনোয়ার

অভিনয়ে—মাহফুজ আহমেদ, শ্রাবন্তী, নুসরাত ইমরোজ তিশা, শাহেদ শরীফ খান, রাইসুল ইসলাম আসাদ, মাসুম আজিজ, অরুনা বিশ্বাস, মোমেনা চৌধুরী, সীমা দাশ গুপ্তা, জয়রাজ, জ্যোত্স্না বিশ্বাস, ফজলুর রহমান বাবু প্রমুখ

চিত্রগ্রহণ—হারুণ আহমেদ খান

আবহসংগীত—ফরিদ আহমেদ

* শুরুতে নুরুল হুদা চরিত্রে শাহরিয়ার নাজিম জয়কে ভেবেছিলেন পরিচালক। প্রযোজক বদলে গেলে জয়ের স্থলাভিষিক্ত হন মাহফুজ আহমেদ।

* নতুন কুঁড়ি চ্যাম্পিয়ন হয়ে শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয়ের পর দীর্ঘ বিরতি দিয়ে এই ধারাবাহিক নাটকে ফেরেন নুসরাত ইমরোজ তিশা। তাঁর চরিত্রটি বেশ জনপ্রিয়তা পায়। প্রতিটি সিরিজেই তিনি অভিনয় করেন।

* নুরুল হুদা হয়ে মাহফুজ আহমেদ এতটাই জনপ্রিয় হন যে দর্শক জরিপে সেরা টিভি অভিনেতা বিভাগে চারবার মেরিল প্রথম আলো পুরস্কার পান। একবার পান জাহিদ হাসান।

* মাহফুজ আহমেদের বিশেষ আগ্রহে নির্মিত হয় ‘অতঃপর নুরুল হুদা’ ও ‘আমাদের নুরুল হুদা’। ‘আমাদের নুরুল হুদা’য় অনেক বছর পর আফজাল হোসেন-হুমায়ুন ফরীদিকে একসঙ্গে পর্দায় দেখা যায়। জাহিদ হাসান, রিয়াজ, মৌসুমীও অভিনয় করেন।

* নুরুল হুদাকে নিয়ে সিনেমা নির্মাণের কথা চাউর হয়েছিল, মাহফুজ আহমেদের ইচ্ছাও ছিল, তবে অরণ্য আনোয়ার রাজি হননি।

* নুরুল হুদা চরিত্র ও গল্পের প্রেক্ষাপট লক্ষ্মীপুর। পরিচালক অরণ্য আনোয়ার ও মাহফুজ আহমেদের জন্মস্থানও এই জেলায়।

Post Comment

You May Have Missed

error: অনুমতি ছাড়া লিখা ও ছবি নকল করা নিষেধ