যেভাবে জাতীয় মাছ হলো ইলিশ

দেশের অন্য যেকোনো মাছের চেয়ে ইলিশের দাম চড়া। এরপরও বর্ষায় ইলিশ কিনে খেতে চায় না, এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া কঠিন। দেশের জাতীয় মাছ হিসেবে স্বীকৃতি ছাড়াও এই মাছ নিয়ে এ দেশের মানুষের আবেগ-উৎসাহের শেষ নেই।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় বলছে, বাংলাদেশে প্রায় ৭৩৫ প্রজাতির মাছ পাওয়া যায়। এর মধ্যে ইলিশ কেন জাতীয় মাছ হলো—তা নিয়ে এখনো কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা সরকারি বা বেসরকারি নথি বা ইতিহাস গ্রন্থে পাওয়া যায়নি। বাংলাদেশের সাগর-নদী, জলাশয় এবং মাছের আন্তসম্পর্কের ইতিহাস খুঁজতে গেলে উজান থেকে নেমে আসা ব্রহ্মপুত্র নদ আর গঙ্গার মতো বিশাল নদীর প্রসঙ্গ আসবে। ওই দুই অববাহিকা থেকে সৃষ্টি হওয়া হাজারো ছোট-বড় নদী বঙ্গোপসাগরে মিশে যাওয়ার ভৌগোলিক কার্যকারণ উঠে আসবে। এসব জলাশয়ে ঘুরে বেড়ানো মাছের মধ্যে ইলিশের পাশাপাশি চিতল মাছের পেটি, পাঙাশ মাছের ঝোল আর রুই মাছের মাথা নিয়েও বাঙালির আবেগ আর ভোজন রসিকতার অনেক প্রমাণ পাওয়া যাবে।

১৯৭২ সালে সদ্য স্বাধীন দেশের জাতীয় মাছ হিসেবে ইলিশকে কেন নির্বাচন করা হলো? সে ইতিহাস সম্পর্কে ১৯৭১ ও ১৯৭২ সালে প্রশাসন ও গবেষণার দায়িত্বে থাকা দেশের শীর্ষস্থানীয় ও প্রবীণ মৎস্য বিশেষজ্ঞদের অনেকেই ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের জাতীয় মাছ, ফল, ফুল, প্রাণীসহ নানা কিছু নির্বাচনের সময়ের সাক্ষী হয়ে আছেন। তবে তাঁদের অধিকাংশই ইলিশকে জাতীয় মাছ করার একক কোনো কারণ বলতে পারেননি।

ইলিশ ছাড়াও রুই, কাতলা, বোয়াল, কই, চিংড়ি, পোয়া থেকে শুরু করে পুঁটি-ট্যাংরা মাছও জনপ্রিয় ছিল। ওই সময় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা এসব ব্যক্তিরা মতামত দিয়েছেন, এই সময়ে এসে ইলিশ নিয়ে যতটা মাতামাতি দেখা যায়, ষাট বা সত্তরের দশকে ততটা ছিল না। ইলিশ জনপ্রিয় ছিল বটে, তবে একই ধরনের জনপ্রিয় মাছ আরও ছিল।

১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ব্যক্তিগত সহকারী মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনে কাছেও জানতে চাওয়া হয়েছিল এত মাছ থাকতে ইলিশ কেন জাতীয় মাছ হলো। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের দায়িত্ব পালন করা এই অর্থনীতিবিদ বলেন, বঙ্গবন্ধুর প্রিয় মাছের তালিকায় ইলিশ যে প্রথম দিকে ছিল তা বলা যাবে না। বঙ্গবন্ধুর খাবারের পাতে বেশির ভাগ সময় পুঁটি, ট্যাংরা, মলা ও পাবদা থাকত। কালেভদ্রে ইলিশ খেতেন। তবে বঙ্গবন্ধুর এই ঘনিষ্ঠ সহচর মনে করেন, শত শত বছর ধরে পদ্মার ইলিশের স্বাদ ছিল বিখ্যাত। দেখতে উজ্জ্বল আর বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায়। কোনো চাষাবাদ ছাড়াই এই মাছ সহজে ধরা যায়। এসব বিবেচনা করে বঙ্গবন্ধু ইলিশকে জাতীয় মাছ করতে পারেন।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর দেশের খাদ্য উৎপাদন ও মজুত ছিল নাজুক অবস্থায়।ওই সময়ে দেশের মানুষের প্রাণিজ আমিষের চাহিদা মেটাতে ইলিশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ১৯৭২ সালে নদ-নদীগুলোতে ব্যাপক ইলিশ পাওয়া গিয়েছিল। গ্রামের দরিদ্র মানুষ ওই ইলিশ ধরে খেতেন। তাই বঙ্গবন্ধু এই মাছকে জাতীয় মাছ নির্বাচন করেছিলেন।

বিশ্বের মোট ইলিশের বেশির ভাগই বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমারে পাওয়া যেত। এখন এককভাবে বাংলাদেশে বিশ্বের ৮৫ শতাংশ ইলিশ পাওয়া যায়। এই বিষয়টি ইলিশকে জাতীয় মাছ করার পেছনে বড় যুক্তি হিসেবে কাজ করেছে, যা পরবর্তী সময়ে সঠিক প্রমাণিত হয়েছে।

ইলিশের জনপ্রিয়তার শুরু: ১৯৮৩ সালে রমনা বটমূলে পয়লা বৈশাখের উৎসবে প্রথমবারের মতো পান্তা-ইলিশ খাওয়ার প্রচলন শুরু হয়। আশির দশকের শুরুটা বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সমাজ বিন্যাসের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দশক। তৈরি পোশাক খাতের বিকাশ, প্রবাসী আয় ও দেশীয় শিল্পের বিকাশের সঙ্গে মধ্যবিত্তের পরিধিও তখন বাড়ছিল। একদিকে পিতৃপুরুষের ফেলে আসা গ্রামের স্মৃতি আর অন্যদিকে শহরে নতুন করে বাঙালি সংস্কৃতিকে পুনর্নির্মাণের চেষ্টা চলছে ঢাকা শহরে। বৈশ্বিক অর্থনীতি ও বিশ্বায়নের সংস্কৃতির হাতছানিও তখন বাড়ছিল।

ঢাকা শহরকেন্দ্রিক এমন এক পালাবদলের সময়ে বাঙালি সংস্কৃতির প্রতীক হিসেবে পয়লা বৈশাখ পালন উদীয়মান মধ্যবিত্তের পরিচিতি নির্মাণের উপলক্ষ হয়ে ওঠে। ১৯৮৩ সালের এক ভোরে একদল তরুণ রমনা বটমূল এবং চারুকলা ইনস্টিটিউটের খোলা চত্বরে পান্তা-ইলিশের কয়েকটি অস্থায়ী দোকান দেন। মধ্যবিত্তের গ্রাম আর শহুরে সংস্কৃতিকে মেলানোর ওই অভিনব চর্চা এর পরের বছরগুলোতে ডালপালা মেলতে থাকে। উৎসবের ওই পান্তা-ইলিশের প্রচলন মধ্যবিত্তের রান্নাঘর আর বৈঠকখানায় স্থান পেতে শুরু করে।

Post Comment

You May Have Missed

error: অনুমতি ছাড়া লিখা ও ছবি নকল করা নিষেধ