‘যে সরকারই আসুক কেউ টাকা পাচার করতে পারবে না’

সময় সাপেক্ষ হলেও দেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। পাশাপাশি আগামীর জন্য এমন পলিসি করা হচ্ছে যে সরকারই আসুক কেউ আর টাকা পাচার করতে পারবে না। ভবিষ্যতে কেউ টাকা পাচার করলে ধরা পড়বে। প্রাইভেট কিংবা পাবলিক সেক্টর যেই হোক ধরা পড়বে। আমরা যে সংস্কার করছি, সেটার মাধ্যমে আমরা ফুটপ্রিন্ট রেখে যাবো। অ্যাটলিস্ট আমাদের পদাঙ্ক যেন পরবর্তী সরকার অনুসরণ করে যেতে পারে। শনিবার ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, গত ১৫ বছরে অর্থনীতিতে যে পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তার স্বল্পমেয়াদি সংস্কার কাজ চলছে। এরই মধ্যে বৈদেশিক মুদ্রায় কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে। তবে সংস্কারের মাধ্যমে দ্রুত পুরো অর্থনীতির আমূল পরিবর্তন সম্ভব নয়।
সবকিছু এখন থেকে সঠিক পথে পরিচালনার জন্য আমরা একটি নতুন রাস্তা তৈরি করছি। পরে যারা আসবে তাদের এ রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হবে। তাহলেই শান্তি ফিরে আসবে। যদি পুনরায় দুর্নীতি শুরু হয় তাহলে জনগণ আবারও ফুঁসে উঠতে পারে।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্র্যাক বিজনেস স্কুলের আয়োজনে ফাইন্যান্সিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক রিফর্মস ইন বাংলাদেশ শীর্ষক এ সংলাপ হয়। সংলাপে দেশের আর্থিক খাতে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার নিয়ে প্যানেল আলোচনা, পোস্টার প্রেজেন্টেশন এবং আর্থিক খাতের চলমান চ্যালেঞ্জসমূহ মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার বিষয়ে আলোচনা করা হয়। অনুষ্ঠানে উপদেষ্টা আরও বলেন, সবাই বলছে এত কিছু করার পরও মূল্যস্ফীতি কেন কমছে না। এর প্রধান কারণ আগের সরকারের ভুল নীতি। এতদিন বিবিএসসহ অন্য সরকারি প্রতিষ্ঠান যেসব তথ্য দিয়েছে সেগুলোতে প্রশ্ন রয়েছে। আমি অর্থ মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছি তথ্যপ্রবাহ সঠিক রাখতে। সঠিক তথ্য না এলে অন্য তথ্যগুলো ভুল আসবে। নীতিমালা প্রণয়ন ঠিক হবে না। এতদিন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা ছিল না বলে এ সমস্যা হয়েছে। একের পর এক দুর্নীতি ও অন্যায় হয়েছে, যার মাশুল দিচ্ছে দেশের জনগণ। সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, বিগত আওয়ামী সরকার ব্যাংকগুলোকে নিঃশেষ করে দিয়ে গেছে। বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানগুলোই ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। আর্থিক খাতে এত বড় ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে, সেটা বাইরে থেকে কল্পনাও করা যাবে না। এত অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা, দুর্নীতি পৃথিবীর আর কোথাও হয়নি। ফিজিবিলিটি টেস্ট না করেই অনেক প্রকল্প নেয়া হয়েছিল বলেও মন্তব্য করেন অর্থ উপদেষ্টা। তিনি বলেন একটি প্রজেক্ট থেকে কতো টাকা আয় হবে, কতো টাকা ব্যয় হবে, কতো দিন সময় লাগবে এবং এসব প্রজেক্টের বিপরীতে নেয়া ঋণের সুদের হার কি হবে, এসব বিষয়ে কোনো গবেষণা করা হয়নি। উচ্চ সুদে ঋণ নেয়া হয়েছে। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পরই একটি সংস্থা আমাদের উচ্চ সুদে ঋণ দিতে চেয়েছিল। আমরা প্রত্যাখ্যান করেছি। কারণ উচ্চ সুদের ঋণ নিলে আমরা পরিশোধ করতে পারবো না। সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করে উপদেষ্টা বলেন, অর্থনৈতিক খাতে যেভাবে লুটপাট হয়েছে, তা থেকে বেরিয়ে আসতে কাজ করা হচ্ছে। অর্থনীতিতে শুধু উন্নয়ন দেখানোর যে প্রবণতা, সেই উন্নয়ন কৌশল পরিবর্তন করতে হবে। অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য ইতিমধ্যে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফসহ বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে বৈঠক করেছি। তারা আমাদের ঋণ দিতে বেশ আগ্রহী। আশা করছি এ অবস্থা দ্রুতই উন্নতি হবে। আদানির বিদ্যুৎ ইস্যুতে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, আদানিকে চার থেকে পাঁচ হাজার কোটি টাকা দেয়া হয়েছে। কিন্তু কোনো কর নেয়া হয়নি। এটি কোনো চুক্তি হলো? আপনারা শুনে আরও আশ্চর্য হবেন, সারের ১৩৫ মিলিয়ন ডলার বিগত সরকার পরিশোধ করেনি। আমরা এসে প্রায় আড়াই বিলিয়ন ডলার ঋণ পরিশোধ করেছি রিজার্ভে হাত না দিয়ে। সদ্য সাবেক গভর্নরের ওপর শ্রদ্ধা রেখে তিনি বলেন, উইথ ডিউ রেসপেক্ট আমি বলতে চাই সাবেক গভর্নর ৪২ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভ থেকে বিক্রি করতে করতে ৩০ বিলিয়নে নিয়ে আসলেন। কারণ ছিল বৈদেশিক মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল করা। কিন্তু কোনো কাজই হয়নি। ১২ বিলিয়ন ডলার নিঃশেষ করে তিনি এখন ঘুমিয়ে আছেন। কিন্তু কোথায় আছেন জানি না। তিনি বলেন, যে প্রতিষ্ঠানের প্রধান রাত ৯টা পর্যন্ত একটা অনুমোদন দেয়ার জন্য বসে থাকে, সেই প্রতিষ্ঠান কেমন চলতে পারে ভাবুন। আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে পলিসিগত লিগ্যাসি বা নীতিগত দীর্ঘসূত্রতা পেয়েছি। যার কারণে কোনো কিছু পরিবর্তন করতে চাইলেই দ্রুত করা যায় না। অর্থ উপদেষ্টা বলেন, আমাদের উন্নয়ন কৌশলটা ভুল ছিল। শুধু প্রবৃদ্ধি, প্রবৃদ্ধি করা হয়েছে। দেখানো হয়েছে রিজার্ভ বাড়ছে, রপ্তানি বাড়ছে, প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, মূল্যস্ফীতি কম রয়েছে। তবে এসব চুঁইয়ে পড়ছে কিনা তা দেখা হয়নি। এটা দেখার দায়িত্ব ছিল নীতি প্রণেতাদের। প্রবৃদ্ধিটা সবাইকে নিয়ে হয়েছে কিনা দেখা হয়নি। তিনি বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি নিয়ে আমরা অস্থির হয়ে যাচ্ছি। আমাদের সরবরাহ ব্যবস্থায় কিছু ত্রুটি আছে। বগুড়া থেকে কাওরান বাজার আসতে ১৭ জায়গায় টাকা দিতে হয়। কিছু জায়গায় মধ্যস্বত্বভোগী দরকার আছে। তবে কেউ-কেউ আছে কিছু না করেই কেবল ফুটপাথে দাঁড়িয়ে চাঁদাবাজি করছে। যে কারণে আমি চেয়েছিলাম কিছু ডিলার পরিবর্তন করতে। তবে পরিবর্তন করলে আরেক গ্রুপ এসে নাকি চাঁদাবাজি শুরু করবে। এটা কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করবেন?’
সংলাপে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যও উন্নয়ন বয়ানের সমালোচনা করে বলেন, উন্নয়নের যে বয়ান সে উন্নয়নের বয়ানের ব্যবচ্ছেদ না করতে পারি, তাহলে আগানো সম্ভব নয়। তিনি বলেন, উন্নয়নের ট্রাজেক্টরির সমস্যা হচ্ছে প্রবৃদ্ধির যে চিত্র আমাদের দেয়া হচ্ছে তাতে তথ্য-উপাত্তের রাজনীতিকরণ করা হয়েছে।
ফলে দেখা যাচ্ছে জিডিপি বাড়ছে কিন্তু বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাড়ছে না। তথ্য-উপাত্ত যে প্রশ্নবিদ্ধ তা বোঝাতে তিনি বলেন, এত জিডিপি হচ্ছে কিন্তু ট্যাক্স জিডিপি বাড়েনি। অনেক বছর হলো এটা ৮-৯ শতাংশে আটকে গেল এত টাকা কই গেল?

Post Comment

You May Have Missed

error: অনুমতি ছাড়া লিখা ও ছবি নকল করা নিষেধ