শুরু হলো বাঙালির স্বাধীনতার মাস

আজ পহেলা মার্চ। ঘটনাবহুল অগ্নিঝরা এ মার্চ বাঙালির প্রতিরোধের মাস। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীনতা অর্জনের জন্য ১৯৭১ সালের উত্তাল মার্চেই বাংলার অবিসংবাদিত নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে বাঙালি জাতি ঝাঁপিয়ে পড়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে। প্রায় মাসব্যাপী নানা রাজনৈতিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তারপর দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর বিশ্ব মানচিত্রে স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে বাংলাদেশ। তাই মার্চ হচ্ছে মহান স্বাধীনতার মাস, বাঙালির পরম গৌরবের মাস।

১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে। এরপর ১৯৭১ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি ঘোষণা করা হয়, জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বসবে ৩ মার্চ। কিন্তু ১ মার্চ দুপুর ১টার দিকে হঠাৎ করেই এক বেতার ভাষণে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন।
সুবর্ণ নাট্যদল বিজ্ঞাপন

ইয়াহিয়ার এ হঠকারী সিদ্ধান্তে মুহূর্তেই দেশব্যাপী তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়ে যায়। সমগ্র জাতি প্রতিবাদের আগুনে জ্বলে ওঠে। ছাত্র, শিক্ষক, আইনজীবী, শ্রমিকসহ সর্বস্তরের মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। ‘তোমার আমার ঠিকানা- পদ্মা মেঘনা যমুনা’, ‘জাগো জাগো – বাঙালি জাগো’, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো- বাংলাদেশ স্বাধীন করো’, ‘জিন্নাহ মিয়ার পাকিস্তান- আজিমপুরের গোরস্তান’ স্লোগানে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মিছিলে মিছিলে উত্তাল হয়ে ওঠে অলিগলিসহ ঢাকার রাজপথ। ‘জয় বাংলা’ ধ্বনিতে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে বাংলার আকাশ-বাতাস।

ঢাকায় বিমান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ঢাকা বিমানবন্দর এবং পিআইএর মতিঝিল অফিসের কর্মীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অফিস ছেড়ে চলে যান।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও ছাত্রলীগের নেতৃত্বে ছাত্ররা মিছিল নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। এ সময় তৎকালীন ঢাকা স্টেডিয়ামে (বর্তমান বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম) পাকিস্তান বনাম বিশ্ব একাদশের ক্রিকেট খেলা চলছিল। খেলা বন্ধ হয়ে গেল। দর্শকরা মিছিল নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ল। সবার গন্তব্য মতিঝিলের হোটেল পূর্বাণী। সেখানে আওয়ামী লীগ সংসদীয় দলের বৈঠকে বসেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

বঙ্গবন্ধু কর্তৃক চূড়ান্ত সংগ্রামের ঘোষণার অপেক্ষায় উন্মুখ স্বাধীনতাকামী বিক্ষুব্ধ মানুষের মুখে ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’ স্লোগানটি তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে।

সংসদীয় দলের বৈঠক শেষে হোটেল পূর্বাণীতে এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব জাতীয় পরিষদ অধিবেশন স্থগিত ঘোষণার তীব্র প্রতিবাদ জানান। তিনি ওই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিয়ে ২ মার্চ ঢাকা শহরে এবং ৩ মার্চ সারা বাংলায় হরতাল পালন এবং ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে জনসভার ঘোষণা দেন। ছাত্র নেতাদের ‘স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করার নির্দেশ দেন। বিকেলে পল্টনে সমাবেশ করেন ছাত্রলীগ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) নেতারা।

ঢাকা ছাড়াও নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, সিলেট, বরিশাল, ময়মনসিংহ, খুলনাসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ সংঘটিত হয়। রাতে মিছিলে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। ফার্মগেটে সেনাবাহিনীর গুলিবর্ষণে ১৪ বছরের কিশোর আমানুল্লাহ, ২৮ বছরের তাজুল হকসহ তিনজন প্রাণ হারায়।

রাতে বঙ্গবন্ধু তাঁর ৩২ নম্বর ধানমণ্ডির বাসভবনে পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে আলোচনার জন্য বৈঠকে মিলিত হন।

অন্যদিকে পাকিস্তানের সামরিক আইন পরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল সাহেবজাদা এম ইয়াকুব খান ১ মার্চ গভীর রাতে ১১০ নম্বর সামরিক আইন আদেশ জারি করে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পাকিস্তানের সংহতি বা সার্বভৌমত্বের পরিপন্থি খবর, মতামত বা চিত্র প্রকাশের ব্যাপারে সংবাদপত্রের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। আইন ভঙ্গ করলে সর্বোচ্চ ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হবে বলেও জানানো হয়।

অগ্নিঝরা মার্চে দেশজুড়ে বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন দল ও সংগঠনের ব্যানারে আয়োজিত এসব কর্মসূচিতে জাতি গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করবে স্বাধীনতার জন্য প্রাণ বিসর্জনকারী সূর্যসন্তানদের।

Post Comment

You May Have Missed

error: অনুমতি ছাড়া লিখা ও ছবি নকল করা নিষেধ