করোনা আর অভাব অনটনের অযুহাতে: সুবর্ণচরে কাজের খোঁজে শ্রমের হাটে ছোটরা
মুজাহিদুল ইসলাম সোহেল::
কাজের খোঁজে শ্রমের হাটে ছোটদের আনাগোনা আর ভিড়। রাস্তার পাশে বসে কিংবা দাঁড়িয়ে আছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছে কাজ নেওয়ার জন্য মহাজনের ।
রাতে ঘুমানোর জন্য কাঁথা, ধানকাটার কাঁচি, সবই আছে ওদের সঙ্গে। প্ল্যাস্টিক কিংবা কাপড়ের থলে আছে কিছু কাপড়।
এ গল্প কৃষিপ্রধান এলাকা নোয়াখালীর উপকূলীয় সুবর্ণচরের হারিছ চৌধুরীর বাজার ওরফে আটকপালিয়া বাজারের। বোরো ধানকাটা মৌসুমে হাটের দিন এখানে বসে শুক্রবার ও সোমবার শ্রমের হাট। দূর—দূরান্ত থেকে এখানে মানুষ আসে শ্রম বিক্রি করতে। বড়দের সঙ্গে আসে ছোটরাও। সংসারের হাল ধরতে কিংবা করোনাকালীন দীর্ঘ সময়ে স্কুল বন্ধে সময়টুকুতে আয় রোজগার করতে । বাবা তার ছোট ছেলেকে, বড়ভাই তার ছোট ভাইকে নিয়ে আসে কাজের সন্ধানে। যে বয়সে লেখাপড়া আর খেলাধূলা করে মায়ের আঁচলের নিচে ঘুমানোর কথা, সেই বয়সে ওরা মহাজনের বাড়িতে ঘুমানোর সব প্রস্তুতি নিয়ে শ্রমের হাটে আসে।
দরবেশ বাজার এলাকার শাহজাহানের বার বছরের ছেলে রাফি কাজের খোঁজে হারিছ চৌধুরীর বাজার শ্রম বাজারে। বাড়িতে মাকে ফেলে রেখে মহাজনের বাড়ি ঘুমাতে পারবে তো? প্রশ্ন করতেই রাকিবের ‘হ্যাঁ’ সূচক জবাব। এটা ওদের গা সওয়া। স্কুলে যাওয়ার কথা এ শিশু কখনোই ভাবেনি। ছোটবেলা থেকে হাত পাকিয়েছে কাজে। রাকিব বলল, সংসার চালাতে টাকার প্রয়োজন, অভাবে কাজে এসেছি কী করবো।
দীর্ঘ দুই বছর করোনাকালীন স্কুল বন্ধ আর দারিদ্রতার কারণে বহু শিশু লেখাপড়া ছেড়ে কাজে। বছর শেষে গেলো ডিসেম্বরে যখন এ সব ছেলেমেয়েদের বার্ষিক পরীক্ষা কিংবা পরীক্ষা শেষে খেলাধুলায় ব্যস্ত থাকার কথা, তখন ওরা মাঠে কাজ করতে ছুটে। ডিসেম্বর পেরিয়ে জানুয়ারী, ফেব্রুয়ারী মার্চ এপ্রিল ও মে মাস যায় স্কুল খোলে না। করোনাও শেষ হচ্ছে না,বাধ্য হয়ে জীবিকার তাগিদে হাতে তুলে নেয় লাঙ্গল—কোদাল অথবা কাঁচি। দিনভর কঠোর পরিশ্রমের পর মেলে সামান্য মজুরি।

হারিছ চৌধুরীর বাজার শ্রমবাজারের শিশু ও অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অভাব অনটনে কাজে যাওয়া শিশুদের মজুরি কম, খাটুনি বেশি। বর্তমান বাজারে তাপদাহের মধ্যে বোরো ধানকাটা ও রবিশস্য খামারের কাজে শিশুদের দৈনিক মজুরি ২৩০ টাকা থেকে ২৫০ টাকা। মজুরি কখনো এর চেয়েও কমে যায়। মজুরি কম হলেও খাটুনি ঠিকই ১০/১২ ঘণ্টা, ভোর ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬/৭টা পর্যন্ত। সারাদিনে এক থেকে দেড় ঘণ্টার বিশ্রাম পায়।
কাজের খোঁজে আটকপালিয়া বাজারে তেরো বছরের কিশোর নঈম উদ্দিন। বয়স ১৩ বছর। বাবা গিয়াস উদ্দিন। বাড়ি লক্ষীপুরের রামগতিতে। বাবা আর মায়ের সঙ্গে কাজ করেই শিশুকাল অতিবাহিত হচ্ছে তার। নাঈম পড়তে চেয়েছিল। কিন্তু সংসারের অস্বচ্ছলতা তাকে এগোতে দেয়নি। টাকার অভাবে বাবা—মায়ের কাছ থেকে তার ইচ্ছার বাস্তবায়ন ঘটেনি। আসতে হয়েছে কাজের হাটে। কাজে না আসলে চলে না এমন প্রশ্নের জবাবে সে বলে বাবা অসুস্থ থাকায় কাজে আসতে হয়েছে।
জিয়াউর রহমান। বয়স সবে ১৩। বাবা আবদুল খালেক। বাড়ি চর মহি উদ্দিন । বাবা বেঁচে নেই।পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে জিয়াউর দ্বিতীয়। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। করোনার কারনে স্কুল বন্ধ , অনিশ্চয়তার কারণে আর্থিক অনটনে লেখাপড়া সামনে এগোয়নি। জীবিকার সন্ধানে নামতে হয়েছে কাজে। বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করতে গিয়ে জীবনে বড় হওয়ার স্বপ্ন থাকলেও সে স্বপ্ন তার এখন আর নেই।
সাইফুল । বয়স ১১ কিংবা ১২।গায়ে স্কুলের পোশাক পরিহিত। চর মহি উদ্দিন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ে চতুর্থ শ্রেণিতে। ঈদের মার্কেট করতে কাজ করতে এসেছে। মা বাবা বলছে কাজ করতে যাও। দুপুরে এসেছে বিকেল ঘনিয়ে সন্ধ্যা হয়ে এসেছে । মহাজনের সাথে দর কষাকষিতে যাওয়া হয়নি।তার চাহিদা ৩৫০ টাকা আর দাম উঠেছে ২৫০ টাকা।
চর আমান উল্যাহ হেদায়েতের ছেলে সুমন (১৭), চর মহিউদ্দিন মো. আলীর ছেলে মো. রুবেল (১৫), চর মহিউদ্দিনের ছেলে আখতার হোসেন (১৬), দরবেশ বাজারের সৈয়দ মকবুলের ছেলে আ.হামিদসহ (৯) আরও অনেক শিশু শ্রমিকের দেখা মেলে আটকপালিয়া বাজারে।
একাধিক শিশু শ্রমিক জানান, কাজে গাফিলতি করলে মজুরি কমে যায়। কিংবা কাজ না পারলে কাজ থেকে চলে যেতে হয়। মহাজনদের বাড়িতে কাজে গিয়ে ভাত খেতে হয় ডাল, বেগুন, সবজি ছাড়াও ভিন্ন পদের তরকারি দিয়ে।
সুবর্ণচর সুশীল সমাজের প্রতিনিধি আবদুল বারী বাবলু জানান, যে বয়সে লেখাপড়া আর খেলাধূলা করে মায়ের আঁচলের নিচে ঘুমানোর কথা, সেই বয়সে ওরা মহাজনের বাড়িতে ঘুমানোর সব প্রস্তুতি নিয়ে শ্রমের হাটে আসে।অন্যদিকে শিশু মজুরদের খাবারের বাজেটে মাংস থাকে না। সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে শ্রমিক শিশুরা মাঠে কাজের উদ্দেশে ছুটে। মহাজনের ইচ্ছানুযায়ী কাজের তালিকায় থাকে ধান কাটা, রবি ফসলের ক্ষেত তৈরি, চারা রোপন, পানি তোলা ছাড়াও নানা ধরনের কাজ।
সুবর্ণচরের আরেকটি শ্রম বাজার থানার হাট । সেটি বসে শনিবার আর মঙ্গলবার।এখানেও বড়দের সঙ্গে দেখা মেলে বিভিন বয়সী বহু শিশুর। এসব শ্রম বাজার ঘুরলে কেউই বিশ্বাস করবে না, ওরা কাজে এসেছে। কেউ হয়তো বাজারের এক কোণে নীরবে বসে আছে। কেউবা দাম—দরের খোঁজ খবর নিচ্ছে। শিশুদের মধ্যে নতুন আসা শিশুরা ঝটলার মধ্যে গিয়ে সবার মুখের দিকে তাকিয়ে অবস্থা বোঝার চেষ্টা করে, আর পুরোনোরা মহাজনের কাচে কাজ খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করে নানাভাবে।
আরেকটি শ্রমের হাট বসে চরবাটা খাসের হাট বাজারে। সেখানে দেখা গেল কাজের সন্ধানে আসা আরো কিছু শিশুকে। নলের চরের মো. এরশাদকে (১১) তার বাবা জামাল উদ্দিন শ্রমের হাটে কাজে নিয়ে এসেছে। গায়ে রোদ্রজ্জ্বল কালছে দাগের চাহনি দেখলেই মনে হবে আজকে কাছে আসা নতুন নয় এর আগেও কাজ করেছেন। বাড়ির কাছে স্কুল না থাকায় লেখাপড়া করার সুযোগ পায়নি নিজাম । বাবার কাছে সংসারের খরচ চালাতে প্রতিনিয়ত কাজে নামাটাই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
অভিভাবক মেহেরাজ বলেন, করোনায় সব কিছু বন্ধ, শহরে রিকশা চালাতাম এখন শহর ছেড়ে গ্রামে এসেছি। এসেই বিপাকে পড়েছি। একা কাজ করে সংসার চালিয়ে নিতে পারছি না। ছেলেসহ কাজ করলে বেশি টাকা পাওয়া যাবে। সংসারটা একটু ভালো চলবে। আমরা অভাবী মানুষ। পোলাপাইনের লেখাপড়া করিয়ে আর কতদূর নিতে পারব।
স্থানীয় লোকদের ভাষ্য মতে, ধানকাটা ও রবি মৌসুমে তরমুজ আর সবজি চাষে বড়দের সঙ্গে ছোটরাও কাজে আসে। অল্প বয়সে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে আয়—রোজগার করে। সুবর্ণচরের হারিছ চৌধুরীর বাজার, চরবাটা খাসের হাট বাজার,পূর্ব চরবাটা ছমির হাট, চরক্লার্ক বাংলাবাজার, মোহাম্মদপুরের আক্তার মিয়ার হাট ও চরওয়াপদা থানাহাটের এলাকায় সবচেয়ে বেশি মানুষ কাজের খোঁজে আসে। হাটের দিন নির্ধারিত জায়গায় রাস্তার ওপর থলে, কাঁচি আর আসবাবপত্র হাতে এদের দীর্ঘ লাইন পড়ে। প্রতিনিয়ত এসব এলাকায় কাজে যোগ দিচ্ছে শিশুরা।
সুবর্ণচরের শহীদ জয়নাল আবেদীন সরকারী মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আলহাজ্ব নজরুল ইসলাম বলেন,বিষয়টি উদ্বেগজনক। দীর্ঘদিন স্কুল বন্ধ থাকায় ঠিকমত অভিভাবক ছেলে মেয়েদের তদারকি করছে না। করোনার এই সময়ে অনেকে অপ্রাপ্ত বয়সে তার সন্তানকে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে। কাজে যাওয়া শিশুদের ক্ষেত্রে তিনি বলেন,অভিভাবক অনেক সময় নিজেদের চাহিদা মেটাতে শিশুদের কাজে পাঠান।



Post Comment