সুবর্ণচরে কৃষকের উচ্চফলনশীল ধানে চিটাশীষ, দিশেহারা কৃষক
সুবর্ণচর( নোয়াখালী) প্রতিনিধি:
গত কয়েক বছর আমন মৌসুমে আমন ধান চাষাবাদ করে পুরো সংসারের চাহিদা মিটিয়ে অবশিষ্ট ধান বিক্রি করেন কৃষক সাহাব উদ্দিন। এবছর তিনি জমানো টাকা ও স্থানীয় এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে এক একর বর্গাজমিতে কোনো ধরণের প্রশিক্ষণ না পেয়ে কৃষি অফিসের সহযোগিতায় ব্রি-৭৫ জাতের উচ্চ ফলনশীল ধানের বীজ নিয়ে চাষ করেছেন।
কৃষি অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা স্বপ্ন দেখিয়েছিল এ জাতে ফলন বেশি হবে অন্য জাতের বীজের চেয়ে । স্বপ্ন ছিল অন্যান্য বছরের মতো এবারও পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে আরো কিছু ধান বিক্রি করতে পারবেন। কিন্তু তার স্বপ্ন এখন বিষাদে পরিণত হচ্ছে। তার চাষকৃত জমির ধানের সব শীষ এখন চিটা হয়ে যাচ্ছে। এতে ক্ষতির মুখে পড়ে দিগি¦দিক ছুটছেন কৃষক সাহাব উদ্দিন।
উপজেলার ৭ নম্বর পূর্বচরবাটা ইউনিয়নের হাজীপুর গ্রামের বাসিন্দা কৃষক সাহাব উদ্দিন, নেপাল চন্দ্র মজুমদার, চর আমানউল্লাহ ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ছানা উল্যাহও মো.আক্তার হোসেনের ব্রি-৭৫ জাতের ধান চিটা হয়ে গেছে।
সুবর্ণচর কৃষি কার্যালয় সূত্র জানা যায়, এ বছর উপজেলার ৮টি ইউনিয়নে ৩৮ হাজার ৭১০ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন জাতের ধানের আমন ধান চাষাবাদ করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে বিআর-১১, বিআর-২২, ব্রি-৪০, ব্রি-৪১, ব্রি-৪৯, ব্রি-৫২, ব্রি-৭১, ব্রি-৭২,ব্রি-৭৫,ব্রি-৮০, ব্রি-৮৭, বিনা-১৬, স্বর্ণা, পাঞ্জা, রাজা, শাইল, ঘিগজ, কালো জিরা, বালিয়া-২ আইএনএইচ-১৬০১৯,বারি হাইব্রীড-৮সহ উল্লেখযোগ্য ২১টি জাতের ধান চাষ করা হয়েছে। এর মধ্যে ব্রি-৭৫ জাতের ধান চাষে ১৮ হেক্টর ভূমিতে আবাদে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রান্তিক কৃষক।
জানা যায়, উপকূলীয় জনপদে আমনের উপরই নির্ভর করে থাকে হাজারো কৃষক পরিবারের একগুচ্ছ স্বপ্ন ও কৃষকের অর্থনীতি। বেশিরভাগ কৃষকের ভূমিতে ব্রি-৭৫ ধানের আবাদে দেখা দিয়েছে চিটা শীষ। চলতি মৌসুমে এই বিশাল ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে চরম হতাশায় ভুগছেন ব্রি-৭৫ জাতের ধান চাষীরা। ২১টি জাতের ধানের মধ্যে ব্রি-৭৫ জাতের ধানের আবাদে বেশির ভাগই চিটা হয়ে গেছে। বিষয়টি উপজেলা কৃষি অফিসে জানালেও তারা কোনো পদক্ষেপ নেয়নি বরং কৃষকের চাষপদ্ধতিকে দুষলেন। কৃষকরা বললেন এ ধান চাষে তাদের কোনো প্রশিক্ষণ বা চাষপদ্ধতি জানানো হয়নি। এছাড়াও উপজেলার বেশিরভাগ কৃষকের অভিযোগ প্রকৃত কৃষক প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনা পায় না।
উপজেলার চর আমান উল্যাহ ইউনিয়নের নয়াপাড়া গ্রামের কৃষক সাহাব উদ্দিন জানান, বেশি ফলনের আশায় আমার ১ একর জমিতে উপজেলা কৃষি কার্যালয় থেকে দেওয়া ব্রি-৭৫ জাতের ধানের আবাদ করি।কিন্তু রোপনের দুই-তিন সপ্তাহের মধ্যে শীষ বের হওয়া শুরু হয়। শীষ বের হওয়ার কয়েকদিনের মধ্যে ধানের শীষগুলো ক্রমেই চিটা হয়ে গেছে। ধানে বালাইনাশক ব্যবহার করলেও তাতেও কোনো সূরাহা হয়নি। এ ধান চাষে আমার ২০হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এখন পূনরায় ধানচাষ করারও সময় নেই।
কৃষক আক্তার হোসেন জানান, গত বছরগুলোতে আমার জমিতে অন্য ধান চাষ করতাম কিন্তু এবার আরও ভালো ফলনের আশায় নতুন জাতের ব্রি-৭৫ ধান আবাদ করেছি। আমার সাড়ে ৩ একর জমির সব ধানের শীষে চিটা দেখে আমি ধান ভাঙিয়ে আবার সে জমিতে আমন দেশী জাতের ধান চাষ করেছি। এতেও কোনো লাভ হয়নি। চাষের সময় চলে যাওয়ায় এ জমিতে আর ধান হচ্ছে না। এক জমিতে দুইবার চাষ করে আমার ৫০ হাজার টাকা ক্ষতি হয়েছে । আমি এখন কিভাবে এ ক্ষতি কাটিয়ে উঠবো, উপায় দেখছি না।

কৃষক সমন্বয়ে গঠিত সমিতির (সিআইজি) সভাপতি মো. ছানা উল্যাহ জানান, উপজেলা কৃষি কার্যালয় থেকে উচ্চ ফলনশীল জাতের ব্রি- ৭৫ ধানের বীজ প্রদান করলে, আমি ১ একর ভূমিতে এ ধানের চাষ করি। চাষ করার কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ধানের শীষ বের হলেও তাতে কোনো রেনু দেখা যায়নি। এখন ধানের সব শীষ চিটা হয়ে গেছে। এ জমিতে পুনরায় ধান লাগানোর সুযোগ নেই।
কৃষকরা অভিযোগ করে বলেন,“বি-৭৫ ধানের বীজ প্রদানের সময় কৃষি কার্যালয় থেকে আমাদের এই ধান চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে কোনো রকম পরামর্শ দেওয়া হয়নি। এবিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো.হারুন অর রশিদকে জানালে তিনি বলেন এবিষয়ে আমার কিছু করার নেই।
সরেজমিনে পূর্ব চরবাটা ইউনিয়ন ,চরআমান উল্যাহ ইউনিয়ন ও চরর্ক্লাক ইউনিয়নে গিয়ে দেখা যায়, কৃষকের চাষ করা ব্রি-৭৫ জাতের ধানের ক্ষেতে ছোট ছোট ধানের সাদা শীষ চোখে পড়ে। দেখা যায়, রেনুবিহীন সবুজ ধানের শীষ, আবার সোনালী হওয়া শীষ গুলো চিটা। ধানের কুশিগুলো দুর্বল। ধানের শীষগুলো চিটা হওয়ায় কোনো কোনো কৃষকের গবাদিপশুর খাদ্য হয়েছে। চলতি মৌসুমে ১৮ হেক্টর ব্রি-৭৫ জাতের চাষকৃত বেশিরভাগ ধানের শীষ চিটা হয়েগেছে বলে জানায় কৃষক।কৃষি কর্মকর্তা ৩ হেক্টর ভূমির ফসল চিটা হয়ে যাওয়ার কথা বললেও কৃষক বলছে ভিন্ন কথা। ১৮ হেক্টর ব্রি-৭৫ ধানের বেশির ভাগ ভূমির ফসল চিটা হয়ে যাচ্ছে।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হারুন অর রশিদ বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বিষয়ে আমাদের কিছু করার নেই। উপজেলায় এবার চলতি আমন মৌসুমে ৩৮ হাজার ৭১০ হেক্টর জমিতে ২১্ন জাতের ধানের আবাদ করা হয়েছে। সুবর্ণচরে প্রথমবারের মতো ১৮ হেক্টর ভূমিতে ব্রি-৭৫ জাতের ধান আবাদ করা হয়েছে। বিভিন্ন ধরণের রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণ আছে ধানে। চলতি মৌসুমে ১৮ হেক্টর ব্রি-৭৫ জাতের ধান চাষের মধ্যে প্রায় ৩ হেক্টর ভূমির ধানের শীষ চিটা হতে পারে বলে তিনি নিশ্চিত করেছেন। কৃষকের চাষ পদ্ধতি না জানার কারণে অনেক সময় চিটা হতে পারে। সে বিষয়ে কৃষকদের বিভিন্নভাবে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তবে তিনি আজকের পত্রিকাকে বলেন, এটি স্বল্প মেয়াদী উচ্চ ফলনশীল জাতের ফসল। এটি সময় এবং চাষ পদ্ধতি জেনে চাষ করতে হয়।



Post Comment