সুবর্ণচরে সরকারী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভূমিদাতা পরিবারটি এখন নিঃস্ব
মুজাহিদুল ইসলাম সোহেল, প্রতিনিধি,নোয়াখালী :
নোয়াখালী জেলার সুবর্ণচর উপজেলার একমাত্র সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় হলো শহীদ জয়নাল আবেদীন সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়। এটি ঐতিহ্যবাহী বিদ্যালয়। উপজেলার সদর দপ্তর থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে চরজুবিলী মৌজায় অবস্থিত।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর নির্যাতনে নির্মম ভাবে নিহত হলেন চরজুবিলীর ডা মুকবুল আহম্মদ এর বড় ছেলে চৌমুহনী সরকারী এস,এ কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের মেধাবী ছাত্র জয়নাল আবেদীন।
তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ২নং সেক্টরের সি জোনের এক্সক্লুসিভ ডিভিশনের দায়িত্বরত একজন চৌকষ মহান মুক্তিযোদ্ধা। এ মহান মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতি রক্ষা এবং চরজব্বারবাসীর সন্তানদের উচ্চ শিক্ষিত করার লক্ষ্যে মাত্র পনের শতাংশ বসতভিটার জায়গাটি রেখে পরিবারের জীবিকা নির্বাহের একমাত্র অবলম্বন এক একর ত্রিশ শতাংশের ফসলী জমি স্কুলের নামে দান কবলা দলিল মুলে রেজিস্ট্রি করে নিজে নিঃস্বত্ববান হন আলী আজ্জম। ১৯৭৩ সালের মার্চ মাসের ২০ তারিখে তিনি দান কবলাটি করে দেন। এরপর ১৯৭৪ সালের জানুয়ারী মাসে বিদ্যালয়টি প্রথম স্বীকৃতি পায়। ১৯৮০ সালে তৎকালীন রাষ্টপতি জিয়াউর রহমান এর এক লক্ষ টাকা অনুদানে বিদ্যালয়টির আর্থিক সমস্যা কিছুটা লাঘব হয়। ১৯৮২ সালের পহেলা জুন এ বিদ্যালয়টি এমপিও ভুক্ত হয়। ২০১১ সালের জুন মএসর ২৬ তারিখে বিদ্যালয়টিকে আধুনিক প্রযুক্তিভিক্তিক মডেল স্কুলে উন্নীত করা হয়। পর্যায়ক্রমে ২০১৮ সালে মুক্তিযোদ্ধার নামে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয়টি জাতীয়করণ করা হয়।
১৯৯২— ব্যাচ এর প্রাক্তন ছাত্র ও ব্যাংক কর্মকর্তা মোহাম্মদ সহিদ উল্লাহ বাচ্চু বলেন, শহীদ জয়নাল আবেদীন মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের ভুমিদাতা আলী আজ্জম ও তার পরিবারের সদস্যদেরকে গত ৫০ বছরে ও কোন ছাত্র— ছাত্রী, শিক্ষক, শিক্ষিকা, অভিভাবক ও এলাকাবাসী ছিনেন কিনা, আমার জানা নাই। ভুমি দাতা আলী আজ্জম মানবেতর জীবন যাপন করে ১৯৮৭ সালে মৃত্যুবরণ করলে অন্যের জায়গায় তাকে দাফন করতে হয়েছিলো। তার বড় ছেলে শামছুল হক (সামু) ১৯৯৪ সালে প্যারালাইসিস আক্রান্ত হয়ে অবশেষে ২০০২ সালের ডিসেম্বরের ২৬ তারিখে মৃত্যুবরণ করলে তাকে তার শশুর বাড়ীর পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
মোহাম্মদ সহিদ উল্যাহ বাচ্চু বলেন, বর্তমানে আলী আজ্জমের রেখে যাওয়া এক মাত্র বসত ভিটায় বসবাস করছে শামছুল হকের পরিবারের সদস্যরা। শামছুল হকের দুই ছেলে তিন মেয়ে। ছোট ছেলে হাবিব উল্লাহ শশুর বাড়ীতে থাকেন তিন ছেলে তিন মেয়েকে নিয়ে। এক মাত্র মেয়ে ফাতেমা বেগম ও মারা যান আর রেখে যান অসহায় এক ছেলেকে। আলী আজ্জম পরিবারের ১৩ জনের সবাই চরম দারিদ্র্র্রতার কষাঘাতে জর্জরিত। এ পরিবারে শিক্ষিত থাকলেও তাদের প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়ে শিক্ষক, ক্লার্ক, অফিস সহকারী,কিংবা দপ্তরী পদে চাকুরী তাদের ভাগ্যে জোটে নি। সহজ,সরল ও অশিক্ষিত হওয়ায় বিদ্যালয়ের সাইনবোর্ড় ও কাগজে কলমে কোথাও আলী আজ্জমের নামটি লিখা হয়নি। পরিবার বা আত্মীয় স্বজনরা সামাজিক ও আর্থিক ভাবে দুর্বল হওয়ায় এই অবদানকে প্রচারও করতে পারেন নি।
তিনি বলেন, আলী আজ্জমের দানকৃত জায়গায় বিশাল জনসভা করেছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, সাবেক প্রেসিডেন্ট হুসাইন মোঃ এরশাদ, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ জাতীয় নেতৃবৃন্দ। আলী আজ্জমের দানকৃত ভুমিতে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টিতে অধ্যয়নরত ছাত্র,ছাত্রীর সংখ্যা বর্তমানে ২৫০০ জন। বিগত ৫০ বছরে এই বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাশ করেছে কয়েক হাজার ছাত্র, ছাত্রী। অধ্যয়নরত কিংবা প্রাক্তন ছাত্র, ছাত্রীদের কেউ ম্যানেজিং কমিটি বা শিক্ষকদের কাছ থেকে আলী আজ্জম সম্পর্কে কোন তথ্য জানানো হয়নি। ভুমি দাতা ও তার পরিবারের সদস্যদের জন্য কোন দোয়া করার নজির আমার জানা নাই। এই বিদ্যালয়ের একজন প্রাক্তন ছাত্র হিসেবে নিজের বিবেকের তাড়নায় এই নিঃস্ব পরিবারটির মানবেতর জীবন কাহিনী না বলে আমার উপায় ছিলো না।
সহিদ উল্যাহ বাচ্চু বলেন, এই পরিবারের সদস্যদের প্রতি সহমর্মিতা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য আমি সকলের প্রতি আহবান জানাচ্ছি। সরকারী উদ্যোগে সকলকে চরাঞ্চলের খাস জমি বন্দোবস্ত এবং আর্থিক সাহায্যের দাবী জানাচ্ছি। বিদ্যালয়ের গেইটে ভুমি দাতা আলী আজ্জমের নাম লিখা এবং কলেজের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত মরহুম আলী আজ্জমের কবরটি সংস্কার করা হোক। প্রতি বছর ছাত্র, ছাত্রী শিক্ষকসহ ম্যানেজিং কমিটির সকলে তার কবর জিয়ারতও দোয়া অনুষ্ঠানের আয়োজন করবেন, এ প্রত্যাশা করি।



Post Comment