জীবন বাঁচল কিন্তু হারিয়ে গেল জীবিকার নৌকা

উত্তাল সমুদ্রে ৩৬ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই। একসময় শেষ হয়ে যায় সঙ্গে থাকা সব খাবার। তারপর বেঁচে থাকার জন্য বড়শির টোপ, সমুদ্র থেকে ধরা কাঁচা মাছ যা পাওয়া গেছে তাই খেয়ে দিন কাটিয়েছেন বাবা ও ছেলে। প্রতিটি সূর্যোদয় ছিল অনিশ্চয়তার, প্রতিটি রাত ছিল মৃত্যুভয়ের। শেষ পর্যন্ত অলৌকিকভাবে তাদের জীবন রক্ষা হয়েছে। কিন্তু দেশে ফেরার আগে তাঁদের সামনে দাঁড়িয়েছে আরেক নির্মম বাস্তবতা। যে ছোট্ট ট্রলারটিকে আঁকড়ে ধরে তারা ৩৬ দিন বেঁচে ছিলেন, যে ট্রলারটি তাঁদের জীবিকার একমাত্র অবলম্বন, সেটি আর তাঁদের সঙ্গে শ্রীলঙ্কায় ফিরছে না।

উদ্ধার হওয়া দুই জেলে হলেন শ্রীলঙ্কার ডেভিনুওয়ারা এলাকার এস এইচ চামিন্দা (৫১) ও তাঁর ছেলে সাউন্ডা হান্নাদিগিপিয়াওয়াটিং (৩০)। পেশায় দুজনই জেলে। ৩৬ দিন আগে চারজন মিলে মাছ ধরতে শ্রীলঙ্কার উপকূল থেকে সাগরে যান। বৈরী আবহাওয়ায় তাঁদের ট্রলারের ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়। ভেসে যেতে থাকে ট্রলার। তিন দিন পর অন্য একটি নৌকার সহায়তায় তাঁদের সঙ্গে থাকা আরও দুই জেলে দেশে ফিরে যেতে সক্ষম হন। কিন্তু ট্রলারটি নিজেদের হওয়ায় সেটি ছেড়ে যেতে রাজি হননি বাবা-ছেলে। হয়তো ভেবেছিলেন ট্রলার বাঁচাতে পারলে জীবিকাও বাঁচবে। সেই সিদ্ধান্তই তাঁদের নিয়ে যায় মৃত্যুর মুখোমুখি এক দীর্ঘ যাত্রায়। পথে আরও এক দুঃস্বপ্নের মুখোমুখি হন তাঁরা। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, আন্দামান সাগরের কাছে মিয়ানমারের কিছু লোক ট্রলারে উঠে দুরবিন, ক্যামেরাসহ মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে যায়। এরপরও তাঁরা ট্রলার ছাড়েননি। সাত দিনের মাথায় শেষ হয়ে যায় মজুত খাবার। এরপর টানা ২৯ দিন বড়শির টোপ ও সমুদ্র থেকে ধরা কাঁচা মাছ খেয়ে কোনোমতে বেঁচে থাকেন। চারদিকে শুধু পানি, মাথার ওপর খোলা আকাশ, আর সামনে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ-এই ছিল তাঁদের পৃথিবী।

গত বুধবার গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়া মহেশখালীর ট্রলার মালিক জিয়াউর রহমানের ট্রলারের জেলেদের নজরে পড়ে ইঞ্জিন বিকল হয়ে ভাসতে থাকা ছোট্ট ট্রলারটি। কাছে গিয়ে তাঁরা দেখেন, দুই ব্যক্তি প্রায় নিস্তেজ অবস্থায় হাতজোড় করে সাহায্য চাইছেন। পরে তাঁদের নিজেদের ট্রলারে তুলে নেওয়া হয় এবং ভাসমান ট্রলারটিকে রশি দিয়ে বেঁধে গত শুক্রবার রাতে মহেশখালীর উপকূলে নিয়ে আসা হয়। উদ্ধারের পর কয়েক দিন জিয়াউর রহমানের বাড়িতে ছিলেন দুই শ্রীলঙ্কান জেলে। পরে গত শনিবার রাতে তাঁদের পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়। সোমবার মহেশখালী জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত তাঁদের নিজ দেশে পাঠানোর আগ পর্যন্ত সমাজসেবা অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণাধীন সেফ হোমে রাখার নির্দেশ দেন। গতকাল তাঁদের ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাঁরা ফিরে যাবেন নিজ দেশে। তবে তাঁদের ফেরার পথের সবচেয়ে বড় বেদনা হয়ে থাকছে সেই ট্রলারটি। মহেশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুস সুলতান জানান, হাজার কিলোমিটার উত্তাল সমুদ্র পাড়ি দিয়ে ট্রলারটি শ্রীলঙ্কায় পাঠানো সম্ভব নয়। আদালত ট্রলারটি উদ্ধারকারী ট্রলারের মালিক জিয়াউর রহমানের কাছে বুঝিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। কারণ, তিনিই গভীর সমুদ্র থেকে ঝুঁকি নিয়ে ট্রলারটি টেনে মহেশখালী উপকূলে নিয়ে এসেছেন। অর্থাৎ, বাবা-ছেলে দেশে ফিরবেন ঠিকই, কিন্তু ফিরবেন খালি হাতে। সমুদ্রে ৩৬ দিনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা হয়তো এক দিন স্মৃতিতে পরিণত হবে। ক্ষুধা, তৃষ্ণা, ঝড় আর মৃত্যুভয়-সবকিছুই হয়তো সময়ের সঙ্গে ম্লান হয়ে যাবে। কিন্তু জীবিকার একমাত্র সম্বল হারানোর ক্ষত সহজে শুকাবে না। যে ট্রলারটির জন্য তাঁরা জীবন বাজি রেখে ৩৬ দিন সাগরে ভেসে ছিলেন, যে ট্রলার ছেড়ে যেতে না চাওয়ার কারণেই মৃত্যু আর জীবনের সীমারেখায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত সেই ট্রলারটিই তাঁদের নয়। তাঁরা বেঁচে ফিরছেন কিন্তু যে স্বপ্ন, যে জীবিকা আর যে সম্বল আঁকড়ে ধরে এত দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়েছিলেন, সেটি রয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের উপকূলে। কখনো কখনো জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি মৃত্যু নয়; বেঁচে ফিরে নিজের সবকিছু হারিয়ে ফেলা।

Post Comment

You May Have Missed

error: অনুমতি ছাড়া লিখা ও ছবি নকল করা নিষেধ