জনগন কেমন রাষ্ট্রপতি চাই ?
বাংলাদেশ এখন একজন নতুন রাষ্ট্রপতির অপেক্ষায়। ২৪ জুলাই মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করার পর ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ। আগামী ৯০ দিনের মধ্যে জাতীয় সংসদে একজন নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন। যেহেতু বিএনপি সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ, তাই ক্ষমতাসীন দল যাঁকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে মনোনীত করবে, তিনিই হবেন পরবর্তী রাষ্ট্রপতি।
বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে তারা তাদের স্থায়ী কমিটিতে আলোচনা করে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। আইনমন্ত্রী বলেছেন, সংসদের পরবর্তী অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হবে। নির্বাচন কমিশন মঙ্গলবার ভারপ্রাপ্ত স্পিকারের সঙ্গে বৈঠক করে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করেছে। বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি দেশের প্রথম নাগরিক। সংবিধানের ৪৮(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, তিনি রাষ্ট্রের অন্য সকল ব্যক্তির ঊর্ধ্বে স্থান লাভ করিবেন।
বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে রাষ্ট্রের প্রধান ব্যক্তির পদটি কখনোই সুখকর ও মর্যাদাপূর্ণ ছিল না। সংসদ নেতা যেহেতু সরকারের প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, তাই রাষ্ট্রপতি পদটি সব সময় আলংকারিক ছিল। বর্তমান সংবিধানে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা খুবই সীমিত। সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কেবল প্রধানমন্ত্রী এবং প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া অন্য সব বিষয়ে রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করতে হয়। এ দুটি বিষয়েও এ পর্যন্ত কোনো রাষ্ট্রপতি একক সিদ্ধান্ত নেননি। বাংলাদেশের প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান, সাবেক রাষ্ট্রপতি বিচারপতি মো. সাহাবুদ্দীন আহমদ ঠাট্টা করে বলেছিলেন, ‘কবর জিয়ারত ছাড়া রাষ্ট্রপতির কোনো কাজ নেই।’
সংসদে ভাষণ দেওয়া থেকে শুরু করে রাষ্ট্রপতির প্রতিটি কাজ সরকারের সিদ্ধান্ত এবং নির্দেশনা অনুযায়ী হতে হয়। সংবিধানের লিখিত ভাষ? অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি ক্ষমতাহীন অলংকার হলেও তাঁর কিছু অন্তর্নিহিত ক্ষমতা থাকে। সংবিধান গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, রাষ্ট্রপতি শুধু অলংকার নন, জাতির অভিভাবক, রাষ্ট্রের ঐক্য ও সংহতির প্রতীক। দেশের বড় সমস্যায়, সাংবিধানিক সংকটে রাষ্ট্রপতি হয়ে ওঠেন ত্রাতা।
একজন রাষ্ট্রপতি সাংবিধানিক ধারা ও গণতন্ত্র অব্যাহত রাখার রক্ষাকবচ। তাই সাধারণ চোখে দেখলে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধান ব্যক্তির ক্ষমতা খুবই সীমিত হলেও, এ পদের ভিতরেই আছে অফুরন্ত ক্ষমতার উৎস। একজন বলিষ্ঠ, দায়িত্বশীল ও ব্যক্তিত্ববান মানুষ এ পদে আপন মহিমায় নেতা হয়ে ওঠেন, হন জাতির অভিভাবক, পথপ্রদর্শক। এ কারণেই রাষ্ট্রপতি পদে অনুগত, স্তাবক আমরা চাই না, যিনি রাষ্ট্রপতি হয়েও একান্ত অনুগত এবং মেরুদণ্ডহীন আজ্ঞাবহ হিসেবে পরিচিত হবেন। আমরা রাষ্ট্রপতি হিসেবে চাই একজন আদর্শবান নেতা, ব্যক্তিত্ববান নাগরিক। যিনি সবার কাছে সম্মানিত ও গ্রহণযোগ্য হবেন।
এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কয়েকটি কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশে আবার নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ব্যবস্থা ফিরে এসেছে। সর্বোচ্চ আদালতের রায় অনুযায়ী, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হবে। একটি নির্বাচিত সরকার থেকে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত জটিল ও স্পর্শকাতর। এ সময়ে নানান ধরনের রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং বিভক্তি মাথা চাড়া দেয়। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অনৈক্য ও সংঘাত সৃষ্টি হয়। ব্যক্তিত্ববান, দৃঢ়চিত্ত একজন রাষ্ট্রপতি থাকলে সহজেই সংকট উত্তরণ সম্ভব। সব রাজনৈতিক দলের কাছে গ্রহণযোগ্য রাষ্ট্রপতির কাছে সব পক্ষ তাদের অভিমত ব্যক্ত করতে পারে। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক সংকট সমাধানের পথ খুঁজে পাওয়া যায়। তাই এবার রাষ্ট্রপতির নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দ্বিতীয় বিষয় হলো, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকে সব রাজনৈতিক দল রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছে। গত বছরের এপ্রিলে ঐক?মত?্য কমিশনে বিএনপিও রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠায় সম্মতি দিয়েছে। জাতীয় সংসদের আগামী অধিবেশনে সরকারি দল সংবিধান সংশোধন বিল উত্থাপন করবে। সংবিধান সংশোধন হলে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়বে। এতে ‘কবর জিয়ারত’ ছাড়াও রাষ্ট্রপতিকে এককভাবে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। তাই রাষ্ট্রপতি পদে একজন অভিজ্ঞ, বিচক্ষণ ও দায়িত্বশীল ব্যক্তি এখন আরও বেশি প্রাসঙ্গিক।
আমরা সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রপতি হিসেবে সত্যিকারের একজন অভিভাবক চাই। কাউকে সান্ত্বনা পুরস্কার হিসেবে বঙ্গভবনে আরাম-আয়েশে জীবনযাপন করার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রপতি চাই না। আমরা এমন একজন ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দেখতে চাই, যিনি এটাকে একটি পবিত্র সাংবিধানিক দায়িত্ব মনে করবেন। সংবিধান ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষায় সারাক্ষণ সজাগ থাকবেন। আমরা এমন রাষ্ট্রপতি চাই না, যিনি এ পদকে উদ্যাপনের উপলক্ষ বানিয়ে ফেলবেন। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় দেশে-বিদেশে ঘুরে বেড়াবেন। জনগণের প্রতি যাঁর কোনো দায়বদ্ধতা নেই, তেমন একজনকে রাষ্ট্রপতি পদে আমরা চাই না।
আমরা এমন একজনকে রাষ্ট্রপতি চাই, যিনি আদর্শবান একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। বিজ্ঞ এবং জনগণের কাছে শ্রদ্ধেয়। জনগণের কাছে যাঁর আলাদা ইমেজ আছে। দেশের মানুষ এমন কাউকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দেখতে চায় না, যাঁর নাম ঘোষণার পর সবাই চমকে উঠে তাঁর পরিচয় খুঁজবে। অজ্ঞাত, অখ?্যাত কাউকে এ পদে দেখতে চাই না, যিনি নিজেই তাঁর নাম ঘোষণা শুনে বিস্মিত হবেন।
দেশের মানুষ চায় এমন একজন রাষ্ট্রপতি যাঁর দলের বাইরেও পরিচিতি এবং গ্রহণযোগ্যতা আছে। এটা যেন তাঁর যোগ্যতার অর্জন হয়, আনুগত্যের পুরস্কার না। আনকোরা কাউকে গোপন আনুগত্যের পুরস্কার যেন রাষ্ট্রপতির পদটি না হয়। সাধারণ মানুষ একজন সৎ, আদর্শবান এবং বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকা ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে দেখতে চায়। এমন কাউকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দেখতে চায় না, যার সততা প্রশ্নবিদ্ধ। অতীতে নানান ধরনের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ আছে এমন ব্যক্তিকে এ পদের জন্য বিবেচনা না করাই ভালো।
এমন একজনকে রাষ্ট্রের প্রধান পদে নির্বাচিত করা হোক, যাঁর প্রতি দেশের সব নাগরিকের আস্থা আছে। নাগরিকরা বিশ্বাস করবেন, তিনি দলমতের ঊর্ধ্বে থেকে জনগণের এবং রাষ্ট্রের পক্ষে অকুতোভয় নেতৃত্ব দেবেন। অগণতান্ত্রিক শক্তির অস্ত্রের মুখে নিজেকে বাঁচানোর জন্য গণতন্ত্রকে বিসর্জন দেবেন না। অসাংবিধানিক শক্তির অন্যায়ের কাছে মাথা নত করবেন না।
দেশের জনগণ কোনো অরাজনৈতিক জনবিচ্ছিন্ন সুশীলকে এ পদে আর দেখতে চায় না। কারণ দেশের মানুষ দেখেছে, ক্ষমতা পেলে সুশীলরা কীভাবে গণবিরোধী হয়ে ওঠেন। জনগণের অধিকার হরণ করেন। দেশের মানুষ চায়, তৃণমূল থেকে তিলে তিলে জাতীয় রাজনীতিতে আলোকিত রাজনীতিবিদ এ পদে অধিষ্ঠিত হোন। যিনি জনগণ ও গণতন্ত্রের কাছে দায়বদ্ধ থাকবেন। যিনি আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের জন্য লড়াই করেছেন। গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রামে যাঁর ত্যাগ অনুকরণীয়।
তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে। রাষ্ট্রপতি নিয়ে অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা নিশ্চয়ই প্রধানমন্ত্রী ভুলে যাননি। সবকিছুতে ‘ইয়েস’ বলা মেরুদণ্ডহীন ব্যক্তি এ রকম সর্বোচ্চ পদের মর্যাদা কীভাবে নষ্ট করেন তা বিএনপির চেয়ে কে ভালো জানে? অযোগ্য লোককে যোগ্যতার চেয়ে বেশি সম্মান দিলে কী পরিণতি হয়, তা অতীতে আমরা বহুবার দেখেছি। এ ধরনের সুবিধাবাদী চাটুকারেরা কেবল দলের জন্যই নয়, জনগণ এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য বিপজ্জনক।
বিএনপি ধীরে সুস্থে দেশের কল্যাণের কথা বিবেচনা করে একজন যোগ্য ব্যক্তিকে বেছে নেবে-এটাই সবার প্রত্যাশা। এ দেশে যোগ্য মানুষের অভাব নেই।



Post Comment