সুবর্ণচরে নতুন স্বপ্ন: আলো ছড়িয়ে দেওয়ার কারিগর সাবেক সচিব এটিএম আতাউর রহমান
সাবেক সচিব এটিএম আতাউর রহমান
এ আলো শিক্ষার আলো, জ্ঞানের জ্যোতি। এ আলো দূর করে দেয় মনের তমসা, হৃদয়ের কূপমণ্ডূকতা, কুসংস্কার ও অনাচার। শিক্ষার দীপশিখা জ্বালিয়ে আলোকে ছড়িয়ে দেওয়ার সংগ্রাম চলছে একটি অজপাড়া জনপদে। এই আলো ছড়িয়ে দেওয়ার কারিগর সাবেক সচিব এটিএম আতাউর রহমান। নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার পূর্ব চরবাটা গ্রামে তিনি জ্বালিয়ে দিচ্ছেন শিক্ষার আলোক শিখা। সুবর্ণচর ঘুরে এসে আলোকজ্বালা এই গল্প জানাচ্ছেন জাহিদুর রহমান
হাজার বছর ধরে মেঘনার উপকূলে তিলে তিলে গড়ে উঠেছিল এক নিটোল সভ্যতা। স্বপ্নিল সমুদ্রপাড়ের অনিন্দ্য সুন্দর নোয়াখালী শহরের দক্ষিণে ছিল এ সমৃদ্ধ জনপদ। ফেনিল সাগরের মাঝে এ এক অপরূপ মনোহর জনপদ। বিশাল সমতল প্রান্তর ছিল এই উপকূল। হাজার বছর ধরে উর্বর পলল ভূমিতে গড়ে ওঠা এ জনপদ প্রায় ২০০ বছর ধরে ভাঙাগড়ার খেলা খেলে খেলে হঠাৎ এক ঝাপটায় নিঃশেষ হয়ে গেল। অবশেষে প্রকৃতির লীলাখেলায় সেখানেই আবার জেগে উঠেছে বিস্তীর্ণ চর। এ রকমই এক অবহেলিত জনপদের নাম নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার ‘পূর্ব চরবাটা’। এ গ্রামে নাগরিক সুবিধা বলতে কিছুই ছিল না। বিশাল প্রান্তরজুড়ে বাসা বেঁধেছিল অদ্ভুত এক আঁধার। আঁধার যত ঘনীভূত হয় আলো ততই সম্মুখবর্তী হতে থাকে- এ কথাই যথার্থ হয়েছে। অবশেষে আলোর ছোঁয়া পেয়েছে এ গ্রামের মানুষ। এখানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে স্কুল-কলেজ, মসজিদ, মাদ্রাসা, পাঠাগার, বিদ্যুৎসহ উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা। ফলে এ এলাকার মানুষ এখন স্বদেশের সীমানা পেরিয়ে বাইরের দুনিয়ায় তার উজ্জ্বল উপস্থিতি ঘোষণা করছে।
প্রজ্বলিত আলোর মশাল দূর করে আঁধার। সন্ধান দেয় উজ্জ্বল আলোকিত আগামীর পথের। সে পথের রথে চড়ে সমৃদ্ধি ও সম্ভাবনার গান গাইতে গাইতে নিরন্তর এগিয়ে চলছে পূর্ব চরবাটার বাসিন্দারা। শিক্ষার আলোয় পূর্ব চরবাটার প্রতিটি গৃহ রাঙাতে এখানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বেশ কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। একজন আলোকিত মানুষের পরশে আলোকিত হয়েছে বিস্তীর্ণ এ জনপদ। বদলে গেছে গ্রামের নতুন প্রজন্মের জীবন। যাদের নুন আনতেই পান্তা ফুরায়, তেমন পরিবারের সন্তানরা সেখানে আলোর মেলা বসিয়েছে।
এ গ্রামেরই সন্তান সরকারের সাবেক সচিব এটিএম আতাউর রহমানের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও কঠিন সংগ্রামে প্রতিষ্ঠিত এসব প্রতিষ্ঠান শিক্ষা বিস্তারে রাখছে অসামান্য অবদান। এখন গ্রামের প্রতিটি ঘরেই শিক্ষিত মানুষের দেখা মেলে। যেন আঁধার ঘরে জ্বলছে ‘আন্ধারমানিক’। লক্ষ্য পূরণে অবিচল নিষ্ঠাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে এনে দিয়েছে সাফল্যের ‘সোনালি পালক’। এ গ্রামের ঘরে ঘরে উচ্চারিত হচ্ছে ‘দিন বদলের বইছে হাওয়া, শিক্ষা আমার প্রথম চাওয়া’।
দুর্গম হওয়া সত্ত্বেও গ্রামটির বেশিরভাগ নতুন প্রজন্ম এখন উচ্চশিক্ষিত। অনেকে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে চাকরি করছেন। গ্রামবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয়, হাইস্কুল, কলেজ প্রতিষ্ঠার কারণে শিক্ষার হার ক্রমেই বাড়ছে। গ্রামের প্রতিটি বাড়ি বা পরিবারে এখন একজন হলেও এইচএসসি কিংবা ডিগ্রি পাস মেয়ে রয়েছে।
দুর্গম চরাঞ্চলের অনেক মেয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে নিজের গ্রাম বা চরের গণ্ডি পেরিয়ে শহরমুখী হচ্ছে। তারা বিশ্ববিদ্যালয় চিনতে শিখেছে। এসব শিক্ষিত মেয়ে সমাজ ও পরিবারের কাছে বোঝা না হয়ে জনসম্পদে পরিণত হচ্ছে। শুধু, শিক্ষাক্ষেত্রেই গ্রামটি এগিয়ে, তা নয়। শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ক্ষেত্রেও এ গ্রামটি আদর্শ। বাসিন্দারা বলেন, গ্রামের এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এ অঞ্চলের তীর্থস্থান। বহু প্রতিকূলতার দেয়াল ভেঙে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো যেভাবে এগিয়ে চলেছে, তার গতিপথ আরও প্রশস্ত হবে।
যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন শিক্ষাসহ নাগরিক সুযোগ-সুবিধাবঞ্চিত অভাবগ্রস্ত এ গ্রামে প্রতিনিয়ত প্রকৃতির সঙ্গে সংগ্রাম করে যেখানে টিকে থাকতে হয় মানুষকে, সেখানে শিক্ষার বিকাশ অলীক স্বপ্নবিলাসের মতো মনে হলেও তা সম্ভব হয়েছে এটিএম আতাউর রহমানের কারণে। একটি পিছিয়ে পড়া গ্রাম কীভাবে বদলে যেতে পারে, তারই দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তিনি। ছোটকাল থেকে কঠিন সংগ্রামে বড় হওয়া এটিএম আতাউর রহমানকে সবসময়ই গ্রামের মানুষের কষ্ট ব্যথিত করত। সেই কষ্ট থেকেই তিনি স্বপ্ন দেখতেন নিজ জন্মস্থানকে বদলে দেওয়ার। একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে যাত্রা শুরু হয়ে এখন গ্রামে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুল, ভোকেশনাল, কলেজও হয়েছে। এ ছাড়া গ্রামে রয়েছে দুটি পাঠাগার, শিশু ও বয়স্কদের জন্য আলাদা কোরআন শিক্ষাকেন্দ্র এবং সুদৃশ্য বিশাল মসজিদ। গ্রামের শিক্ষার্থীরা একাডেমিক পড়াশোনার বাইরে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে ও এগিয়ে যাচ্ছে। বিকেল হলেই গ্রামে বিশাল খেলার মাঠে কয়েক ভাগ হয়ে চলে ফুটবল, ক্রিকেট ও ভলিবল খেলা। আবার কেউ কেউ পাঠাগারের বইয়ের ভাণ্ডারে ডুবে থাকেন। এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য এখনও চলছে সীমাহীন সংগ্রাম। সরকারি সুযোগ-সুবিধা অনেক সময় না পেলেও আতাউর রহমান বসে থাকেন না। নিজের অর্থায়নে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন কাজ করেন সংগ্রামী এ মানুষটি। গ্রামটিকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে তার পৈতৃক বাড়ির নিজস্ব অংশের জমি দান করলেন। সে জমিতে বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়, হাইস্কুল ও কলেজের পাঁচটি পাকা ভবন নির্মিত হয়েছে। এর মধ্যে দুটি দ্বিতল ভবন ও টিনশেড বিশাল ভবন রয়েছে দুটি।
অবসর নিলেও মনের টানে, নাড়ির টানে ছুটে যান নিজ গ্রামে। নিজের হাতে গড়া প্রতিষ্ঠানগুলোর সুবিধা-অসুবিধার কথা শোনেন। এসব প্রতিষ্ঠানের মায়া তিনি যেমন ছাড়তে পারেননি, তেমনি গ্রামবাসীও তার অবদান মনে রেখেছে।
সরকারের সর্বোচ্চ পদে থেকেও শিক্ষকদের নিয়ে হাটে-বাজারে ও বাড়ি বাড়ি গিয়ে স্থানীয় গ্রামবাসীকে তাদের শিশুদের বিদ্যালয়ে ভর্তি করতে উদ্বুদ্ধ করেন। বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিশুদের ডেকে এনে স্কুলে ভর্তি করান। শত প্রতিকূলতা তাকে দমাতে পারেনি। এগিয়ে গেছেন সামনের পথে। লক্ষ্য একটাই- গ্রামটিতে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়া। তার এ মহৎ লক্ষ্য আজ সফলতার মুখ দেখেছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর কারণে পশ্চাৎপদ সেই গ্রামটির চেহারাই পাল্টে গেছে।
শুরুর কথা
শিক্ষাবঞ্চিত শিশু-কিশোরদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় চরবাটা হাবিবিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়। ১৯৯৪ সালে বিদ্যালয়টি রেজিস্টার্ড ও ২০১৪ সালে জাতীয়করণ হয়। প্রথমে একটি টিনশেড ঘরে এর কার্যক্রম শুরু হলেও এখন পাকা ভবনে পাঠদান চলছে।
আরেকটি দীপশিখা
প্রাথমিক শিক্ষা শেষে গ্রামের শিক্ষার্থীরা কোথায় পরবর্তী সময়ে শিক্ষা গ্রহণ করবে? আশপাশে কোথাও ছিল না মাধ্যমিক বিদ্যালয়। ফলে ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় ‘পূর্ব চরবাটা জুনিয়র হাইস্কুল’। ১৯৯৮ সালে সরকারি স্বীকৃতি ও এমপিওভুক্তি এবং ১৯৯৯ সালে মাধ্যমিক স্বীকৃতি, ২০০২ সালে মাধ্যমিকের এমপিওভুক্তি ২০০৭-০৮ শিক্ষাবর্ষ থেকে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের অধীন উচ্চ মাধ্যমিকের মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা শাখা এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীন এইচএসসি (বিএম) শাখায় কম্পিউটার অপারেশন ও সেক্রেটারিয়েল সায়েন্সে ছাত্রছাত্রী ভর্তির অনুমতি পায়। ২০০০ সালে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এসএসসি ভোকেশনাল শাখা চালু করা হয়।
একঝাঁক তারুণ্য ও প্রতিভাদীপ্ত শিক্ষকের অপরিসীম যত্ন আর মেধাবী হাতের স্পর্শে এখানকার শিক্ষার্থীরা কৃতিত্বপূর্ণ ফল অর্জন করতে সক্ষম হচ্ছে।
এসএসসি পরীক্ষায় প্রথমবারের মতো অংশগ্রহণ করে ২০০১ সালেই চমৎকার ফল করে স্কুলটি সবার নজর কাড়ে। প্রতিষ্ঠানটির অগ্রগতির ডানায় তখনই নতুন পালক গজাতে শুরু করে। ২০০২ সাল থেকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। শিক্ষার্থীরা অষ্টম শ্রেণির জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষা ও মাধ্যমিক পরীক্ষায় জিপিএ ৫সহ অন্যান্য কার্যক্রমে সাফল্যের পুরস্কার তাদের ঝুলিতে পুরতে থাকে।
প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ মো. সালেহ উদ্দিন বলেন, গ্রামের ছেলেমেয়েদের এখানে শিক্ষা থেকে শুরু করে মানুষের মতো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার শিক্ষা দেওয়া হয়। এখানে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবাই একটি পরিবারের মতো। এ কলেজে রয়েছে বিজ্ঞান ল্যাব, নিয়মিত শরীরচর্চা, খেলাধুলা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, বিতর্ক ও সাধারণ জ্ঞান প্রতিযোগিতা, চিত্রাংকন, সঙ্গীতচর্চা, বিশাল খেলার মাঠ, আধুনিক কম্পিউটার ল্যাব ও ইন্টারনেট সুবিধা, বিভিন্ন দুর্লভ বইসহ সমৃদ্ধ পাঠাগার, দূরের শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসিক নিবাস, শিক্ষা সফর ও নিয়মিত হোম ভিজিট।
কলেজের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এটিএম আতাউর রহমান বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর আলো জ্বালিয়ে রাখতে হবে যুগ যুগ ধরে। প্রতিষ্ঠানগুলো বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব আগামী প্রজন্মের।



Post Comment