নোয়াখালীর সুবর্ণচরে চরাঞ্চলে বসতি গড়ে স্বাবলম্বী নারীরা
সুবর্ণচর প্রতিনিধি ::
বছর বিশেক আগেও মেঘনায় জেগে উঠা নতুন ভূমি চর নঙ্গোলিয়ায় জনমানব শূন্য ছিল। ১৭ বছর আগে শূন্য হাতেই পা রেখেছিলেন শাহানা বেগম। আত্ম বিশ্বাস আর দৃঢ় মনোবল থাকার কারণে আত্মনির্ভর শাহানা বেগম। নতুন জেগে ওঠা নোয়াখালীর এ চরে বসতি গড়া অতটা সহজ ছিল না। দস্যূ ও প্রাকৃতিক দূর্যোগের সঙ্গে এক রকম লড়াই করতে হয়েছে তাকে। সেই লড়াইয়ে জয়ী শাহানাই। সরকারিভাবে বন্দোবস্ত পাওয়া এক একর জমিতে গড়ে তুলেছেন চার চালা টিনের ঘর। বাড়ির চারপাশে বিভিন্ন ধরনের বনজ ও ফলদ বৃক্ষ। বছরজুড়ে ‘সর্জন’ পদ্ধতিতে সবজির চাষ করছেন। এর বাইরে আছে নিজের দুটি পুকুর, একটি মুরগির খামার ও দুটি সেলাই মেশিন। সব মিলিয়ে শাহানার রোজগার কোনো মাসে ২০ হাজার, কোনো মাসে ২৫ হাজার টাকা।
শাহানা বেগম এখন গর্বের সঙ্গে বলতে পারেন, কোনো এক সময় এনজিওর কাছে ২ হাজার টাকা চেয়েও পাইনি। সেই এনজিওই আজ আড়াই লাখ টাকা ঋণ দেয়ার জন্য ঘুরছে।
মেঘনা নদীভাঙনের শিকার নূরজাহান বেগমের সংগ্রামটাও শাহানার মতোই। ২০ বছর আগে তিনিও শূন্য হাতেই সুবর্ণচরের চরক্লার্কে পা রেখেছিলেন। গোলাভরা ধান না থাকলেও তার রয়েছে গোয়ালভরা গরু, খোঁয়াড়ভরা হাঁস—মুরগি। বছরজুড়ে সবজির ক্ষেত তো আছেই। মৌসুমে আমন ধানও চাষ করেন। বনদস্যু ও প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে নূরজাহান বেগমের পরিবারেও এখন সমৃদ্ধির ছোঁয়া।
শাহানা ও নূরজাহানের পরিবারের মতো আরো প্রায় ৩৫ হাজার পরিবার রয়েছে নোয়াখালীর দক্ষিনাঞ্চলে মেঘনার বুকে জেগে ওঠা ১৬টি চরে। প্রতিটি পরিবারেরই রয়েছে নদীভাঙনের পর নতুন চরে দিন বদলের গল্প। সরকারের দেয়া জমি ও কৃষিতে ভর করে এখন স্বনির্ভর এসব পরিবার।
ভূমিহীন এসব পরিবারের সংগ্রামের ক্ষেত্রটা তৈরি করে দিয়েছে সরকারেরই একটি প্রকল্প। ১৯৭৭ সালের দিকে নেদারল্যান্ডস সরকারের সহায়তায় ‘ভূমি পুনরুদ্ধার প্রকল্প’ হাতে নেয় সরকার। প্রথম দিকে নদী থেকে ভূমি উদ্ধার শুরু হয়। প্রকল্পটি প্রায় ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত চলে। প্রকল্পের অর্থায়নে পানি উন্নয়ন বোর্ডের একাধিক প্রকল্প ব্যাপক বেড়িবাঁধ নির্মাণ করে। এতে মেঘনার বুকে জেগে ওঠে প্রায় এক হাজার বর্গকিলোমিটার নতুন ভূমি।
চরের বাসিন্দাদের জীবনমান উন্নয়নে ১৯৯৪ সাল থেকে বাংলাদেশ ও নেদারল্যান্ডস সরকার যৌথভাবে চর উন্নয়ন ও বসতি স্থাপন প্রকল্প (সিডিএসপি ১) শুরু করে। এ অঞ্চলের মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন শুরু সেখান থেকেই। এখন চলছে প্রকল্পের চতুর্থ পর্যায় (সিডিএসপি ৪)।
সিডিএসপি—৪এর ল্যান্ড সেটেলমেন্ট অ্যাডভাইজর মো. রেজাউল করিম জানান, নামমাত্র মূল্যে সরেজমিন পরিদর্শন ও যাচাই—বাছাই করে প্রকৃত ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে নতুন ভূমি বন্দোবস্ত দিয়েছে সরকার। এর মধ্যে সিডিএসপি—১ এর আওতায় প্রায় ৫ হাজার ৮৪২ একর, সিডিএসপি—২ এর আওতায় ১০ হাজার ১৮৮ একর, সিডিএসপি—৩ এর আওতায় ১০ হাজার ৮২০ একর ও সর্বশেষ সিডিএসপি—৪ এর আওতায় সুবর্ণচরের জিয়ার চর, হাতিয়ার নাঙলিয়া, নলের চর ও কেয়ারিং চরে ২৬ হাজার ৮৫০ একর ভূমি বন্দোবস্ত দেয়া হয়েছে। প্রকল্পের চারটি পর্যায়ে ৩৪ হাজার ৬৫৪টি পরিবারকে বন্দোবস্ত দেয়া হয়েছে সর্বমোট ৪৫ হাজার ৫০ একর ভূমি।
ভূমি বন্দোবস্তের পাশাপাশি উন্নত করা হয়েছে এখানকার সড়ক যোগাযোগ, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা ও কৃষিরও। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঠেকাতে এলাকায় গড়ে তোলা হয়েছে সামাজিক বনায়ন। এসবের ফলে বেড়েছে চরবাসীর মাথাপিছু আয়। বর্তমানে চরাঞ্চলের মানুষের মাথাপিছু আয় প্রায় সাড়ে ৯ হাজার টাকা, যা আগে ছিল ৩ হাজার টাকার কিছু বেশি।
চর উন্নয়ন ও বসতি স্থাপন প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে চরাঞ্চলে ফসলের নিবিড়তাও আগের চেয়ে বেড়েছে। কৃষি বেঞ্চমার্ক জরিপের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ বছর আগেও চরাঞ্চলে ফসলের নিবিড়তা ছিল ১২৭ শতাংশ। সিডিএসপি চতুর্থ পর্যায় বাস্তবায়নের ফলে এখন তা ১৮৪ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ অধিকাংশ জমিতে এখন দুই ফসল ফলছে। প্রতি একর জমি থেকে আগে যেখানে দুই থেকে আড়াই টন ফসল পাওয়া যেত, এখন পাওয়া যাচ্ছে এর দ্বিগুণ। বর্তমানে এ অঞ্চলে ধান, তেলজাতীয় বীজ, বারোমাসি সবজিসহ সব কৃষিপণ্য উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। কৃষিপণ্য উৎপাদনের পাশাপাশি হাঁস—মুরগি, গরু—মহিষ, ছাগল ও ভেড়ার খামার গড়ে তোলা হচ্ছে। সর্জন পদ্ধতিতে সবজি ও মাছের খামার গড়ে তোলা হয়েছে। সড়ক ব্যবস্থার উন্নয়ন হওয়ায় এসব উৎপাদিত পণ্য সহজে ৩০—৪০ কিলোমিটার দূরে জেলা শহরে নিয়ে যেতে পারছেন কৃষক।
স্বাবলম্বী এসব পরিবারের সদস্যরা বলছেন, সুবর্ণচর ও হাতিয়ার ১৬টি চরে নারী—পুরুষের সমান অধিকার দিয়ে জমি বন্দোবস্ত দিয়েছে সরকার। ফলে নিজের জমির মালিকানার অধিকার নিয়ে পুরুষের পাশাপাশি সমানতালে কাজ করছেন নারীরা, স্বনির্ভরতায় যা বড় ভূমিকা রাখছে।
নতুন চরের এসব মানুষের নতুন জীবন গড়া খুব কাছ থেকে দেখেছেন সুবর্ণচর উপজেলা চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ খায়রুল আনাম সেলিম। তিনি বলেন, বিভিন্ন স্থানের নদীভাঙা মানুষগুলো নিরুপায় হয়ে সুবর্ণচর ও হাতিয়ায় জেগে ওঠা নতুন চরে বসতি গড়তে থাকে। সরকারের কাছ থেকে জমি বন্দোবস্ত পেয়ে শুরু হয় তাদের বদলে যাওয়ার সংগ্রাম। সেই সংগ্রামে টিকে যাওয়া মানুষদের প্রত্যেকেই আজ স্বাবলম্বী।



Post Comment