তারেকের সঙ্গে আলোচনায় আগ্রহী জয়, কিন্তু নির্বাচন মানতে নারাজ

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে দেড় বছর আগে ক্ষমতা হারানো শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় বলেছেন, সদ্য অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে তিনি স্বীকৃতি না দিলেও, বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে আলোচনায় বসতে তার কোনো আপত্তি নেই।

জয়ের ভাষায়, ‘আমি সবসময় আলোচনায় বিশ্বাস করি। বিষয় যত কঠিনই হোক বা যার সঙ্গেই হোক, সংলাপই আমার পথ। জীবনজুড়েই আমি এভাবেই চলেছি।’

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের দিন ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম আইটিভির সাংবাদিক মাহাথির পাশা ভিডিও কনফারেন্সে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত জয়ের সাক্ষাৎকার নেন। বাংলাদেশ সময় শনিবার ভোরে সাক্ষাৎকারটি সম্প্রচারিত হয়।

সাক্ষাৎকারে ২৪-এর আন্দোলন দমন, আওয়ামী লীগের দায়, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড, তার দেশে ফেরার সম্ভাবনা, নির্বাচনে জামায়াতের উত্থান ও দলের সংস্কারসহ নানা প্রশ্নের জবাব দেন জয়।

জাতিসংঘ ও বিভিন্ন দেশ এই নির্বাচনকে স্বাগত জানালেও জয় একে ‘প্রহসন’ হিসেবে আখ্যা দেন। তার দাবি, দেশের বৃহত্তম দল এবং প্রগতিশীল শক্তিগুলোকে বাইরে রেখে নির্বাচন আয়োজন করা হয়েছে। এতে জামায়াতে ইসলামী তাদের প্রকৃত জনসমর্থনের চেয়ে বেশি প্রভাব পেয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তার মতে, এমন পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হবে না এবং ভবিষ্যতে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।

তিনি প্রশ্ন তোলেন—দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ থাকা অবস্থায় নির্বাচন কীভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে? উদাহরণ টেনে বলেন, যুক্তরাজ্যে যদি টোরি বা লিবারেলদের যে কোনো একটি দলকে নিষিদ্ধ করা হতো, সেটিও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি করত।

তবে সাংবাদিক মনে করিয়ে দেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ই জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। জবাবে জয় বলেন, সরকার সরাসরি নিষিদ্ধ করেনি; আদালতের রায়ের কারণে তারা নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। গঠনতন্ত্র সংশোধন করলে তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ ছিল।

আওয়ামী লীগ আমলের তিনটি নির্বাচনেও কারচুপির অভিযোগ ছিল—এ প্রসঙ্গে জয় বলেন, অভিযোগগুলো পুরোপুরি সঠিক নয়। তার দাবি, প্রথম ও তৃতীয় নির্বাচনে বিরোধী দল অংশ নেয়নি। দ্বিতীয় নির্বাচনের আগে বিভিন্ন জরিপেই আওয়ামী লীগের বড় ব্যবধানে জয়ের ইঙ্গিত ছিল। কিছু প্রশাসনিক অনিয়ম হয়ে থাকতে পারে, তবে তা সামগ্রিক ফলাফলে প্রভাব ফেলত না বলে তার বক্তব্য।

এখন যদি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও বিদেশি সাংবাদিকরা তাদের মূল্যায়নে বলেন যে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে, তাহলে মেনে নেবেন কিনা—সেই প্রশ্ন রাখা হয় জয়ের সামনে।

তিনি বলেন, না, মেনে নেওয়া যায় না। আবার বলছি, দেশে যে অল্পসংখ্যক বিদেশি পর্যবেক্ষক রয়েছেন, তারা সরকারের তত্ত্বাবধানে চলাচল করছেন। কারণ তাদের স্বাধীনভাবে দেশের ভেতরে ভ্রমণের সুযোগ নেই। আর সত্যি বলতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও এতটাই খারাপ যে সেটি নিরাপদ নয়। তাহলে তারা আসলে কতটা পর্যবেক্ষণ করতে পেরেছেন?

সাংবাদিক তাকে প্রশ্ন করেন, গত ১৫ বছরে দুর্নীতি, অপহরণ, গুম, মতপ্রকাশ দমনের অভিযোগ—এসব বিবেচনায় নিয়ে আপনার কি মনে হয় না যে আজকের পরিস্থিতির জন্য আংশিকভাবে আওয়ামী লীগ নিজেই দায়ী?

জবাবে জয় বলেন, না, কারণ একই ধরনের অভিযোগ বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালেও তাদের বিরুদ্ধে আনা হয়েছিল। অথচ এখন তাদেরই সেলিব্রেট করা হচ্ছে।

জুলাই-আগস্টের আন্দোলন নিয়ে জয় স্বীকার করেন, সরকার কিছু ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে—বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যথাসময়ে সংলাপে না বসা এবং বিষয়টি সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করতে না পারা। তবে তার দাবি, জামায়াতে ইসলামী পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে আন্দোলনকে সহিংস রূপ দেয়।

জাতিসংঘের হিসাবে ওই সময় ১,৪০০ জন নিহত হওয়ার প্রসঙ্গে জয় বলেন, পুরো সময়ের দায় আওয়ামী লীগের ওপর চাপানো ঠিক নয়। তার মতে, নিহতদের মধ্যে পুলিশ সদস্য ও সরকার-সমর্থক কর্মীরাও ছিলেন। কয়েকশ মানুষের মৃত্যু হয়েছে—এটি দুঃখজনক। তবে সব হত্যার দায় আওয়ামী লীগ সরকারের নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।

শিশু মৃত্যুর প্রসঙ্গে তিনি দাবি করেন, সরকার আন্দোলন চলাকালেই নিহতদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে এবং সমবেদনা জানিয়েছে।

শেখ হাসিনার ফাঁস হওয়া অডিও নিয়ে প্রশ্ন উঠলে জয় বলেন, প্রচারিত অংশটি খণ্ডিত। তার দাবি, প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের সাধারণ নির্দেশ দেওয়া হয়নি; কেবল সহিংস আক্রমণের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য অনুমোদন ছিল।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে—এমন প্রশ্নে জয় জানান, এতে তিনি উদ্বিগ্ন নন। তার বিশ্বাস, দেশের অন্তত অর্ধেক মানুষ এই নির্বাচন মেনে নেয়নি।

শেখ হাসিনা কখনো বাংলাদেশে ফিরবেন কি না, সে প্রশ্নে জয় বলেন, আমার কোনো সন্দেহ নেই, তিনি একদিন ফিরবেন। তিনি বহুদিন ধরেই অবসর নিতে চেয়েছেন। তার প্রায় পুরো জীবনই কেটেছে বাংলাদেশে; সেখানেই তিনি স্বচ্ছন্দ বোধ করেন। কোনো একসময় তিনি ফিরবেন।

ভারতে অবস্থান নিয়ে জয় বলেন, ভারতই এখন তার মায়ের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা। সেখানকার আইনি প্রক্রিয়াকে তিনি বাংলাদেশের তুলনায় বেশি নির্ভরযোগ্য বলে উল্লেখ করেন।

প্লট দুর্নীতির মামলায় পাঁচ বছরের দণ্ড পাওয়া জয় জানান, তিনি দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন। ভবিষ্যতে দেশে ফেরার ইচ্ছা আছে, তবে তার রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেই বলে দাবি করেন।

তার ভাষায়, আমি কখনও ক্ষমতা বা অর্থকে জীবনের লক্ষ্য হিসেবে দেখিনি।

বাংলাদেশের আদালত প্লট দুর্নীতির মামলায় সজীব ওয়াজেদ জয়কেও পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে। এ অবস্থায় তিনি দেশে ফিরবেন কি না, জানতে চান মাহাথির পাশা।

জয় তখন বলেন, আমি বাংলাদেশে থাকি না। আমার পুরো জীবনে মোট সাত বছর বাংলাদেশে কাটিয়েছি। ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে আমি যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাস করছি।

বাংলাদেশে যাওয়ার কোনো ইচ্ছা আছে কি না জানতে চাইলে জয় বলেন, অবশ্যই একসময় ফিরব। দেখুন—তারেক রহমান, যিনি… দণ্ডিত হয়েছিলেন, তিনি এখন সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী। এসব পরিস্থিতি চিরস্থায়ী হয় না।

তাহলে কি জয় বলতে চাইছেন যে, একদিন হয়তো তিনি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার লক্ষ্যে দেশে ফিরে রাজনীতিতে নামবেন?

তারেক রহমান বলেছেন, তিনি প্রতিশোধের রাজনীতির পথে যেতে চান না। সে কথা মাথায় রেখে জয় কি তাকে মামলা প্রত্যাহারের অনুরোধ করবেন। আইটিভির এই প্রশ্নে জয় বলেন, এটা আমার হাতে নেই; আমি দেশে থাকি না। এটা পুরোপুরি দলের সিদ্ধান্তের বিষয়—তারা কী করতে চায়, সেটি তারাই ঠিক করবে।

তিনি বলেন, বিএনপি বাংলাদেশের আরেকটি বড় রাজনৈতিক দল। অবশ্যই তাদের সঙ্গে কথা বলা উচিত; আমি সবসময়ই সেটা বলে এসেছি। বিএনপির কখনোই নির্বাচন বর্জন করা উচিত হয়নি। আর তারেক রহমান… আমি বলছি, নির্বাচনটি ভুয়া। তবে যদি তিনি প্রধানমন্ত্রী হন, তাহলে অবশ্যই আমরা তার সঙ্গে কথা বলব এবং তার সঙ্গে কাজ করব।

বাংলাদেশে মুজিব পরিবার ও জিয়া পরিবারে বংশানুক্রমিক নেতৃত্ব নিয়ে অনেকে সমালোচনা করেন; এর অবসান হওয়া উচিত কি না, সেই প্রশ্ন করা হয় সজীব ওয়াজেদ জয়কে।

জবাবে তিনি বলেন, এটা কি বংশানুক্রমিক রাজনীতি? আমরা নিজেরা রাজনীতিতে থাকতে চাই? নাকি তৃণমূল পর্যায়ের মানুষ দলীয় কাউন্সিলে বারবার আমাদের ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেন? প্রশ্নটি সেখানেই। দেখুন, আমি যদি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হতে চাইতাম, অনেক আগেই হতে পারতাম। আমার মা এক দশকের বেশি সময় ধরে আমাকে নির্বাচনে দাঁড়াতে, সংসদ সদস্য হতে উৎসাহ দিয়ে আসছিলেন।

তাহলে কেন জয় প্রধানমন্ত্রী হতে চাননি? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কারণ জীবনে এমন মানুষও থাকে, যার যা আছে, তাতেই সন্তুষ্ট। সবাই ক্ষমতা বা অর্থকে জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে দেখে না। আমার কখনোই ক্ষমতা বা টাকার প্রতি লোভ ছিল না। আমি স্বাচ্ছন্দ্যে থাকতে পারলেই খুশি।

Post Comment

You May Have Missed

error: অনুমতি ছাড়া লিখা ও ছবি নকল করা নিষেধ